23 May Tantra Pith kamakhya
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
ভারতের সনাতন ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র এই কামাখ্যা মন্দির। ভক্তদের মঙ্গল কামনায় বিশেষ হোম পূজা করে থাকি কামাখ্যা মন্দিরে। মায়ের মন্দিরের মাহাত্ম্য এবং সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করলাম (যদিও ত্রিদেব সহ ইন্দ্রাদি দেবগণ যার চরণ বন্দনা করেন তাঁকে বর্ণনা করবার শক্তি বা সাহস কোনোটাই আমার নেই তবু বেশ কিছু গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে আমার মতন করে বর্ণনা করলাম)। ভবিষ্যতে মায়ের এই ক্ষেত্র নিয়ে আরও আরও বর্ণনা লেখার ইচ্ছে রইল। সকলে মা কামাখ্যা ক্ষেত্রে গিয়ে একবার হলেও পূজা করবেন, তাঁর শ্রীচরণ বন্দনা করবেন।
“যোনিপূজা মহাপূজা তৎসমা নহি সিদ্ধিদা।
তত্র দেবিং যজেদ্ধিমান সৈব দেবী ন চান্যথা।।”- (কামাখ্যা তন্ত্র)
~ অর্থাৎ যোনী পূজাই সর্বশ্রেষ্ঠ পূজা। সাধকের মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করবার জন্য এই পূজা ভিন্ন অন্য কোনো পূজা নেই। তাহলে শাস্ত্রের এই ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা গেল যে কামরূপ কামাখ্যা সাধক ও ভক্তদের জন্য কতটা প্রসিদ্ধ এই পীঠ। স্বয়ং ত্রিদেব সহ দেবগণ যাঁকে পূজা করেন তাঁর বন্দনা করাই আমাদের মতন সাধারণ মানুষের একমাত্র কর্ম। তাই কামাখ্যা তন্ত্রে আরও বলছে –
“যোনিরূপা মহাবিদ্যা কামাখ্যা বরদায়িনী।
বরদানন্দা নিত্যা মহাবৈভববর্দ্ধিনী।।
সর্ব্বেষাং জননী সাপি সর্ব্বেষাং তারিণী মাতা।
রমনী সৈব সর্ব্বেষাং স্হূলা সূক্ষ্মা সদা শুভা।
কামাখ্যাবিমুখা লোকা নিন্দিতা ভুবনত্রয়ে।।
~অর্থাৎ, যোনীরূপা আদিশক্তি মহামায়া মা কামাখ্যা সদা মহাবৈভব বর্দ্ধিনী, তিনিই সকলের জননী। যে ব্যক্তি দেবী কামাখ্যার পূজা না করেন, তিনি এই ত্রিজগতে নিন্দিত।
বলাবাহুল্য, এই শক্তিপীঠ ভারত তথা সমগ্র বিশ্বের একমাত্র শক্তিক্ষেত্র যেখানে সাধন বা যে কোনো ক্রিয়া করলে চতুবর্গ ফলপ্রাপ্তি হয়। তাই আমি গুরুর কৃপায় মায়ের কাছে বারবার ছুটে যাই ভক্তদের নিয়ে। আর মাও কৃপা করে তাদের উদ্ধার করেন। কারণ, সর্বোপরি ইষ্টদেবী ও মা কামাখ্যার আশীর্বাদ ভিন্ন তাঁর ক্ষেত্রে পৌঁছে পূজা বা হোম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বৃহন্নীল তন্ত্রে বলছে –
“পীঠার্চ্চনং মহাদেবি যত্র সিদ্ধিরনুত্তমা।
পীঠানাং পরমং পীঠং কামরূপং মহাফলম্।।
তত্র যৎ ক্রিয়তে পূজা সকৃদ্বাপি মহেশ্বরি।
বিহয়া সর্ব্বপীঠানি তস্যদেহে বসাম্যহম্।।”
~ অর্থাৎ, এই পীঠ সমস্ত পীঠের থেকে শ্রেষ্ঠ ও ফলপ্রদ। এই শক্তি ক্ষেত্রে সাধক-ভক্ত যদি একবারও একাগ্র চিত্তে পূজা করে তাহলে স্বয়ং মা তাঁর দেহে বসবাস করেন। যুগে যুগে এই কামাখ্যা ক্ষেত্র সর্ব তীর্থের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্ররূপে খ্যাত হয়েছে। দেবগণ যখন আসুরিক শক্তির জ্বালায় জর্জরিত তখন মা কামাখ্যাই তাঁদের রক্ষা করেছেন, কখনও কুমারী রূপে আবার কখনও মায়া বিস্তার করে। কালিকাপুরাণ বলছে –
“কামরূপং মহাপীঠং যো জানিতে নরোত্তমঃ।
স দিব্যজ্ঞান- সম্পন্নঃ পরং নির্ব্বাণমাপ্নুয়াৎ ।।
যঃ কামরূপে সকলে পীঠযাত্রাং সমাচরেৎ।
আসাদ্য সকলং পীঠং পূজয়েৎ সর্ব্বদেবতাঃ।।
দশ পূর্ব্বান্ দশ পরানাত্মানঞ্চৈকবিংশতিম্।
দিব্যে জ্ঞানে নিধায়াশু সর্ব্বৈর্ন্মুক্তিমিয়াৎ সহ।।
~ অর্থাৎ, যিনি এই পীঠের মাহাত্ম্য সম্পর্কে জানেন তিনিই দিব্যজ্ঞান লাভ করে পরম নির্বাণ লাভ করবেন। শুধু তাই নয়, এই শ্লোকে আরও বর্ণনা করছে যে, এই পীঠে কোনো ভক্ত যদি পূজা পাঠ করেন তাহলে তার বংশের পূর্ব পুরুষের সঙ্গে সে নিজেও দিব্যজ্ঞান লাভ করবে এবং চিরমুক্তি লাভ করবেন।
দেবী কামাখ্যা সর্বকালের ভক্তদের কামনা বাসনা পূরণ করেন। যোগিনীতন্ত্রে বলছে –
” কৃতে কর্ম্মণি সিধ্যেত কামনাষু সুরেশ্বরি ।
ততো মর্ত্ত্যঃ কামরূপমিতি রূপমকল্পয়েৎ।।”
~ অর্থাৎ, এই পীঠে ভক্তদের কামনা বাসনা পূরণ হয়। ভক্তরা যে মনোবাঞ্ছা নিয়ে মায়ের কাছে আসেন সেই মনস্কামনা পূরণ করেন দেবী কামাখ্যা। তাই এই পীঠের নাম কামরূপ। পাশাপাশি কলিযুগের সাধনার মূল ক্ষেত্র এই কামাখ্যা। সাধকের সাধনা সম্পূর্ণই হয় না কামাখ্যা ক্ষেত্রে না পৌঁছালে। সত্যযুগে উড্ডীয়ান পীঠের প্রাধান্য, ত্রেতায় পূর্ণশিলা, দ্বাপরে জলশিলা আর কলিযুগে পাপ বিনাশে মহামায়া কামাখ্যা যোনীপীঠ পূজাই প্রধান:
” উদ্দীয়ানাস্য দেবেশি প্রাদুর্ভাবঃ কৃতে যুগে।
পূর্ণ-শৈলস্য সম্ভূতিস্ত্রেতাযুগমুখৎভবৎ।।
দ্বাপরে জলাশৈলস্য কামাখ্যায়াঃ কলৌ যুগে।
ঘোরস্য কলিপাপস্য বিনাশায় মহেশ্বরি।।” (যোগিনীতন্ত্র)
আবার কুব্জিকা তন্ত্রে বলছে –
“কামরূপং মহাপীঠং সর্ব্বকাম ফলপ্রদম্।
কলৌ শীঘ্রফলো দেবি কামরূপে জপঃ স্মৃতাঃ।”
~ অর্থাৎ, কামরূপ মহাপীঠে সাধনা এবং প্রার্থনা করলেই ভক্ত সিদ্ধিলাভ করেন। কলিযুগে ভক্ত বা সাধক এই স্থানে বসে জপ করলেই তাঁর আকাঙ্ক্ষিত ফলপ্রাপ্তি ঘটে। তাছাড়া, এই নীলাচল পাহাড়েই দশমহাবিদ্যার মন্দির রয়েছে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে বলা হচ্ছে যে –
“যোনিপীঠং কামগিরৌ কামাখ্যা তত্র দেবতা।
যত্রাস্তে ত্রিগুণাতীতা রক্তপাষাণরূপিণী।।
তত্রাস্তে মাধবঃ সাক্ষাদুমানন্দোৎথ ভৈরবঃ।
সর্ব্বদা বিহরেদ্দেবি তত্র মুক্তির্ন সংশয় ।।
তত্র শ্রীর্ভৈরবী দেবী তত্র নক্ষত্রদেবতা।
প্রচণ্ডচণ্ডিকা তত্র মাতঙ্গী ত্রিপুরাত্মিকা।।
বগলা কমলা তত্র ভুবনেশী চ ধূমিনী ।
এত্যানি নব পীঠানি শংসন্তি পরভৈরবাঃ।।”
~ অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রে ত্রিগুণাতিতা যোনীপীঠ বিদ্যমান তিনিই মা কামাখ্যা। পাশাপাশি উমানন্দ ভৈরব এবং হয়োগ্রীব বিরাজমান। এই স্থানে মুক্তিলাভ হবেই কারণ, এখানে ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা, কালিকা, ভুবনেশ্বরী, ধুমাবতী ও ত্রিপুরা এই নববিদ্যা বিরাজমান।
উল্লেখ্য, দেবী কামাখ্যা সর্ব দেবগণের পূজিতা। সমস্ত দেবগণ তাঁর শ্রীচরণ বন্দনা করেন এবং মায়ের কৃপা পান। মহাভাগবতে বলছে:
“সিদ্ধিমন্ত্রাঃ সমভবং স্তত্র জপ্ত্বা মহামনুম্।
খেচরত্বমনুপ্রাপুস্তথা দেবাদিপূজ্যতাম্।।
যোনিরূপাং ভগবতী সুগুপ্তাং মুনিসত্তম্ ।
দৃষ্ট্বা স্পৃষ্টা চ সম্পূজ্য জীবন্মুক্তো ভবেন্নরঃ।।
ক্ষেত্রস্পর্শনমাত্রেণ ব্রহ্মহাপি নরঃ ক্ষণাৎ।
মুচ্যতে নাত্র সন্দেহঃ কামাখ্যায়াঃ প্রসাদতঃ।।”
~ অর্থাৎ, কামাখ্যা যোনীমণ্ডলে মন্ত্র জপ করে ব্রহ্মা সহ দেবগণ সিদ্ধ হয়ে খেচরত্ব লাভ করেন এবং সবার কাছে পূজিত হয়েছিলেন। আবার যোগিনীতন্ত্র বলছে:
” কামাখ্যায়াশ্চ মাহাত্ম্যং সর্ব্ববেদার্থসন্মতম্।
ব্রহ্মত্বং ব্রহ্মণা প্রাপ্তং বিষ্ণুত্বঞ্চ ময়া পুণঃ।।
শিবতঞ্চ শিবেনৈব কামাখ্যায়াঃ প্রসাদতঃ..।।”
~অর্থাৎ, কামাখ্যা দেবীর মাহাত্ম্য ত্রিলোকে বন্দিত। এই মায়ের পীঠে ব্রহ্মা ব্রহ্মাপদ, বিষ্ণু বিষ্ণুপদ এবং শিব শিবত্ব লাভ করেছিলেন। তাই ভক্তি দিয়ে মায়ের যোনীপীঠে পূজা করাই উচিত। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
(ছবিতে মা কামাখ্যার মন্দির ও আমি হোম করছি মন্দিরে তারই একটি ছবি দিলাম)