15 Jul রথের কারুকার্য
~ কলমে অধম সোমানন্দ
বহু প্রতীক্ষিত ক্ষণ উপস্থিত হতে আর বাকি কয়েক মুহূর্ত, আগামীকাল রথে আরোহণ করবেন প্রভু শ্রীজগন্নাথ দেব ও তাঁর ভাই বোন। এই রথ নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয় প্রতিবার বসন্ত পঞ্চমীর তিথিতে, তারপর নির্মাণ কার্য আরম্ভ হয় অক্ষয় তৃতীয়ার তিথিতে। সেই নির্মাণ হতে হতে আজ সম্পূর্ণ রথটি নির্মাণ হয়ে গিয়েছে।
তিনটি রথ দাঁড়িয়ে রয়েছে মূল মন্দিরের সিংহ দরজার সামনে, কাল মন্দির থেকে ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসবেন তিনি, উঠবেন সেই নব নির্মিত রথে। শ্রীজগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ। এর উচ্চতা ৪৫ ফুট। মোট ৮৩২টি কাঠের টুকরো লাগে এই রথ নির্মাণ করতে। প্রভুর রথের চূড়ায় চক্র ও শ্রীগরুড়দেব অধিষ্ঠিত থাকার জন্য এর আরও দুটি নাম চক্রধ্বজ বা গরুড়ধ্বজ। এই রথের রক্ষক স্বয়ং শ্রীনৃসিংহনাথ ও সারথির নাম মাতলি। চারটি অশ্বের নাম রেচিকা, মোচিকা, সূক্ষ্মা ও অমৃতা। এদের প্রত্যেকের গায়ের রঙ সাদা।
এরপর শ্রীবলভদ্রদেবের নীলবর্ণের রথের শীর্ষভাগে তালচিহ্নের কারণে রথের নাম তালধ্বজ। একে আবার হলধ্বজও বলে। এর উচ্চতা ৪৭ ফুট। চাকার ব্যাস সাড়ে ছয় ফুট। রথটি নির্মাণ করা হয় ৭৬৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে। পাটাতন ৩৪ বর্গফুট। চাকার সংখ্যা ১৪টি। চাকাগুলি চতুর্দশ মন্বন্তর-রূপ ব্রহ্মার পরমায়ু কালের ব্যঞ্জক। একই সঙ্গে চতুর্দশ ভুবনেরও প্রতীক। তালধ্বজ রথের রক্ষক শেষাবতার। এই সারথির নাম সুদ্যুম্ন, রথে অশ্বের সংখ্যা চার। এদের নাম স্থিরা, ধূতি, স্থিতি ও সিদ্ধা।
আর দেবী সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন। দেবী সুভদ্রার রথের চাঁদোয়া কালো ও লাল রঙের এবং এটি রথ তিনটির মধ্যে আকৃতিতে সবচেয়ে ছোট। রথটিতে ৪টি ঘোড়া আছে এবং ঘোড়াগুলোর রঙ লাল। রথটির উচ্চতা ৪৩ ফুট এবং এতে ১২টি চাকা রয়েছে। রথটির রক্ষক দেবী হলেন দেবীজয়দুর্গা এবং সারথি অর্জুন নামে পরিচিত।
ভারতের সকল মন্দিরের মধ্যে একমাত্র কালীঘাটের দেবী কালিকার ভোগ এবং পুরীর শ্রীক্ষেত্রে মহাপ্রভুর ভোগ মহাপ্রসাদ হিসাবে পরিচিত। মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথের মন্দিরস্থিত দেবী শ্রীশ্রীবিমলার মন্দিরে মা প্রসাদ গ্রহণের পর যে যৎকিঞ্চিৎ অংশটি আমাদের মতন অধমদের জন্য রাখেন সেটি মহাপ্রসাদ।
গতকাল পুরীর শ্রীক্ষেত্রে মহাপ্রভুর নেত্র উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হল, এবার সন্ধ্যায় তিনি সকল ভক্তকে দর্শন দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তাই এবারের খুব সংক্ষিপ্ত দর্শনে তিনি আমাদেরও সুযোগ দিয়েছিলেন তাঁকে দেখার। আর সত্যি কথা বলতে, নেত্র উৎসবে প্রভু জগন্নাথকে একদম সামনে থেকে দর্শনের সুযোগ আমিও কোনোবার হাতছাড়া করিনা।
চলতি বছর, মন্দিরের অন্দরে প্রবেশ করেই দেখলাম তিনি সানন্দে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ভক্তদের দর্শন দিচ্ছেন আর সকলকে যেন বলছেন আমি আবারও আসছি তোমাদের সকলের সঙ্গে দেখা করব বলে…..। সত্যি বলতে মণিমার ওই চোখের দিকেই যেন কিছুক্ষণ আটকে গেছিলাম আর এমন ভাবেই আটকে গেছিলাম যে তিনিও মন্দিরে আমাকে দীর্ঘক্ষণ রাখলেন, এত ভিড়, এত ভক্তের ভিড়ে কোনো প্রহরী আমাদের তাঁকে দর্শন করতে বাঁধা দেননি।
এবার এক সেবায়েত প্রভুর প্রসাদী তুলসী ভক্তদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলেন যাতে সকলেই সেই প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমি শত চেষ্টা করেও সেই তুলসী হাতের মুঠোয় রাখতে পারিনি, মন খারাপ করেই চলে আসছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল বিশেষ ঘটনা, যা কোনো তাত্ত্বিক যুক্তিতে বর্ণনা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
হঠাৎ এক মহিলা রক্ষী শতশত প্রসাদী তুলসী নিয়ে এই দিক থেকে ওইদিকে যাচ্ছিলেন, ঠিক আমাদের সামনে এক গোছা প্রসাদী তুলসীপত্র আসে, তিনি স্বয়ং দিতে চাইলে কার সাধ্য সেই কৃপা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা! না, কারোর সাধ্য নেই। প্রভুর কৃপা এতটাই যে, এত পরিমাণ তিনি প্রসাদ পাইয়ে দিলেন যা আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। মন্দির থেকে একরাশ আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম নিজেদের গন্তব্যে।
আগামীকাল রথযাত্রা মহোৎসব, সর ভারতের ভক্তগণ আসবেন প্রভুকে একটিবার দেখবেন বলে। আমরাও পথে দাঁড়িয়ে থাকব তাঁর কৃপাদৃষ্টি নিতে। অতীতেও তিনি এমন অনেক লীলা দেখিয়েছেন যার কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি নেই, আর এবারও তিনি তাঁর কৃপাদৃষ্টি দিচ্ছেন এই অধমের ওপর এটাই গুরুকৃপা। গুরুর আশীর্বাদ থাকলে তবেই সেই কৃপা পাওয়া সম্ভব, না হলে নয়। মায়ের কৃপায় এবং প্রভুর আশীর্বাদে সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।