মায়ং ক্ষেত্রে চতুর্দশীর রাত: আত্ম উপলব্ধি - Somanandanath
16773
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16773,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

মায়ং ক্ষেত্রে চতুর্দশীর রাত: আত্ম উপলব্ধি

মায়ং ক্ষেত্রে চতুর্দশীর রাত: আত্ম উপলব্ধি

~ কলমে সোমানন্দ নাথ

জীবনে বহুবার বহু অলৌকিক লীলার সাক্ষী থাকতে পেরেছি গুরুর কৃপায়। শুধু আমি নয়, আমার সঙ্গে যে সমস্ত ভক্তরা যাত্রা করেন তারাই এই লীলা দেখেছেন বা অনুভব করেছেন। আমার মন্ত্রগুরু বহুদিন আগেই জানিয়েছিলেন যে, এখন মায়ের ইচ্ছেতে ঘুরেছিস, মা যখন বসতে বলবে তখন বসবি। তাই গুরুর আদেশকে মাথায় নিয়ে ভক্তদের মঙ্গল কামনায় বিভিন্ন সতীপীঠ হোম, পূজা করার সুযোগ পাচ্ছি। তবে সত্যি বলতে কি, মায়ের কৃপা না থাকলে এই ভাবে মা তাঁর নানান পীঠে আমাকে পূজা করবার সুযোগ দিতেন না বলেই মনে করি। বলাবাহুল্য, এতে আমার একটাই কথা বড় মনে হয় যে, বহু উচ্চকোটির সাধক বলেছিলেন যে, “তীর্থ ভ্রমণ করলে পাপের ক্ষয় হয় এবং কর্মফল ভালো হয়। তীর্থ ভ্রমণ করলে বহু অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকা যায় যে গুলি অন্য কিছুতেই মেলে না।” তাই গুরুর কৃপা নিয়ে আমি মায়ের নানান পীঠ ক্ষেত্রে পৌঁছে যাই ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে, শুধু কৃপা পেতে, কিছুটা সময় মায়ের সঙ্গে কাটাতে।

এবার বহু ভক্তই বলবেন মা তো আমাদের অন্তরে বিরাজমান, তাহলে আপনার এত তীর্থ ভ্রমণের কি প্রয়োজন! তাদের বলি, সেই উপলব্ধি করেছি বলেই তো মা তাঁর নানান পীঠে নানান অলৌকিক কাহিনীর সন্ধান দেন বা প্রকাশ করেন। মা অন্তরে বিরাজমান বলেই আমার হাত দিয়ে তিনি নানান শুভকর্ম করিয়ে নেন, আমার হাত দিয়ে আর্ত মানুষের সেবা করান, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কি? কিছুই না।

যাইহোক, সম্প্রতি দেখতেই পাচ্ছেন যে আমার কমবেশি প্রতিদিনই সতীপীঠ হোম থাকে, সেটি কখনও কালীঘাট, কখনও কঙ্কালীতলা, কখনও কামাখ্যা আবার কখনও যোগাদ্যা। এক সময় আমার আচার্যদেব বলতেন যে, জীবনে যতবেশি সময় মায়ের সেবা পূজায় দিতে পারবি তত পারমার্থিক শান্তি পাবি, যে শান্তির কোনো মূল্য হয়না, কোনো পরিমাণও হয়না, হয় শুধুই অনুভূতি।

নবরাত্রি উৎসবের আগে মা কামাখ্যা আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে পূজা, হোম করবার। আমিও ভক্ত শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গেছিলাম মায়ের কাছে। প্রথমদিন মাকে দর্শন করে হোম ক্রিয়ায় বসেছিলাম, আর অদ্ভুত ভাবে প্রতিবারের মতন এবারও হোমের আগুন প্রজ্জ্বলিত হতেই ভক্তের আনাগোনা শুরু হয়, বলা যায় যে মনে হয় কথা থেকে তারা এসে উপস্থিত যে মায়ের হোমের সাক্ষী থাকবেন বলে।

উল্লেখ্য, সেইদিন রাতেই কুমারী পূজার আয়োজন করেছিলাম, কারণ আমার ছোট্ট মায়েদের মধ্যেই তো তিনি আছেন। তাঁদের আশীর্বাদ আমার জীবনে খুবই প্রয়োজন তাই, বলতে পারেন এক প্রকার মৃন্ময়ী মায়ের আশীর্বাদ পেতেই আবার কুমারী পূজার আয়োজন করেছিলাম। সঙ্গে ছিল আমার অর্ধাঙ্গিনী সহ শিষ্য অর্জুনানন্দ, শিষ্য অভেদানন্দ, বুবুন, অশেষ, প্রসেনজিৎ, মিলি, দীপনারায়ণ সহ আরও ভক্তরা।

কুমারী পূজা শেষ করে রাতের প্রসাদ পাওয়ার পরই মনে হল যে, আজকে একটু রাতের কামাখ্যা ঘুরে দেখলে কেমন হয়! শিষ্যদের বলতেই, তারাও বেবস্থা করে ফেলল আমাকে রাতের নীলাচল পাহাড় দর্শন করবে বলে।

বেরিয়ে পড়লাম কিছু শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ভূতনাথ শ্মশান, আর সেখানেই পৌঁছেই শ্মশানবাসিনীর দর্শন পেলাম, মন ভরে গেল মাকে দেখেই। এরপর পৌঁছে গেলাম দাহক্ষেত্রে, যেখানে মেলে পরম শান্তি, জীবনের আসল অর্থ বোঝার পথ, উত্তর মেলে এই আমিত্ব রেখে লাভ কি! কিছুই তো নয় আমার। সবই তাঁর, তিনি কৃপা করে আমাকে এইগুলি উপলব্ধির সুযোগ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত আমিত্ব দূর করার আর মায়ের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করার।

শ্মশান থেকে এবার কি মনে হল, হঠাৎ গাড়ির দাদাকে বললাম, একটু অন্ধকার পরিবেশে নিয়ে চলুন, আর বাকি শিষ্যদের দাবি এলো মায়ং যাবো গুরুদেব। তখন বাজে রাত ১১:৩০, চতুর্দশী চলছে, মঙ্গলবার, আমরা বেরিয়ে পড়লাম মায়ং যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

এবার মায়ং যাওয়ার রাস্তায় এতটাই ঘন অরণ্য এবং নির্জনতা যেন এক অন্য অনুভূতি তৈরি হচ্ছে সকলের মধ্যে। হঠাৎ আমার গাড়ির পিছন থেকে যেন দুবার আলোর জলকানি লুকিং গ্লাসে পড়ল, এদিকে পেছনে তাকাতে কোনো গাড়ি লক্ষ্য করা গেল না। শুরু হল আরও রোমাঞ্চকর পরিবেশ, সেই সঙ্গে বিভিন্ন বন্য পশুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা এবং একই সঙ্গে অনুভব করাও যাচ্ছে। মনে হচ্ছে অন্ধকার যেন গ্রাস করছে সকলকে, হঠাৎ পর পর দুটি বিড়াল রাস্তা পার করল, আমরা কিছুক্ষণ গাড়ি থামিয়ে দাঁড়ালাম। গাড়ির আলো বন্ধ হতেই অন্ধকারের বিভীষিকাময় সময় উপস্থিত হল, সকলেই সম্পূর্ণ ভাবে অনুভব করলাম যে, কেউ গাড়ির দিকে নজর করছে এবং পিছু করছে আমাদের।

তারপর আলো জ্বালিয়ে গাড়ির দাদা বলে বসল, “মহারাজ, আপনি এতক্ষণ বলছেন ঠিকই, আমি এখন বলছি কয়েকটা কথা। আজকে আমার মনে হচ্ছে রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না, এবং আর পিছনে ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। কেউ মনে হচ্ছে আমাদের ফলো করছে। এই কথা বলেই আমাদের দেখালো যে , তার হাতের সমগ্র লোমকুপ রীতিমতো খাড়া হয়ে উঠেছে, সে ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘ নিশ্বাস নিচ্ছে এবং ঢোক গিলছে।

বাকিদের আশ্বস্ত করে বললাম, আরও অনেকটা দুর যেতে হবে আমাদের, এই সব অভিজ্ঞতা নিজেদের কাছে রেখে দাও। বলতে বলতে আরও গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে যেতে শুরু করলাম, আর সেই পিছু নেওয়ার অনুভূতি আরও ঘন হল।

হঠাৎ করে আবার সেই লুকিং গ্লাসে আলোর ঝলকানি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতেই আমি ওই দাদাকে বললাম, “আপনি কিছু খেয়াল করলেন?” উত্তরে দাদা বলছেন, কি আলোর কথা তো? আমি এই নিয়ে দুবার লক্ষ্য করেছি। (এদিকে পিছনে কোনো গাড়ি নেই, তাহলে লুকিং গ্লাসে আলো দেবে কে? এর কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি অন্তত আমার কাছে নেই।)

এবার আরও একটি ভয়াবহ রাস্তায় প্রবেশ করলাম আমরা। দাদা বলে উঠলেন, “এই দিকে রাস্তা আছে? কেউ তো যায়না এই দিকে, কোনো জনপ্রাণী নেই অথচ আমরা যাচ্ছি, গাড়িতে কিছু সমস্যা তৈরি হবে না তো?” আশ্বস্ত করে বললাম, কোনো ভয় নেই, হঠাৎ দুই লক্ষ্মী পেঁচা আমাদের গাড়িকে পার করে বেরিয়ে গেল। বুঝলাম, কোনো শুভ ইঙ্গিত রয়েছে, ভয় নেই।

মায়ের পূজকদের উপস্থিতি বারবার এটাই প্রমাণ করে যে, কোনো নেতিবাচক শক্তি বা এনার্জি তাদের চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। তেমনই একটি কথা গাড়ির দাদা বলে উঠলেন, “আমি এমন রাস্তা দিয়ে এই প্রথমবার এই নিশিতে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, আমি এই রাস্তা দিয়েই হাই রোডের দিকে যাবো, আর পিছন দিকে যাবো না, আমার ঠিক ভালো লাগছে না এই জায়গাটি। যাইহোক, মায়ং স্থান তন্ত্রের নিগূঢ় জায়গা, এখানে বশীকরণ থেকে শুরু করে নানান তন্ত্র নিয়ে অতীতে দীর্ঘ চর্চা হতো, বর্তমানেও হয়। এই গ্রামের মাহাত্ম্য এতটাই বেশি যে বর্তমানে চলতে থাকা সমাজকে এক মুহূর্তে বদলে দিতে পারে।

গুরুর কৃপায় আমিও এক আচার্যকে পেয়েছিলাম যিনি এই মায়ং থেকে এসেছিলেন উত্তর কলকাতার গিরিশপার্কে। তখন আমি স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র, আর তিনি এতটাই দিব্য জ্যোতি সম্পন্ন ছিলেন যে কলকাতার তাবড় তাবড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কর্মজীবী তাঁর চরণে বসে থাকতেন। চতুর্দশীতে তাও আবার নিশিতে মায়ং প্রবেশ করে ঠিক সেই অনুভূতি হল আমার যে, এই গ্রাম বা অঞ্চলে তন্ত্র সাধনার নিগূঢ় বিষয় আলোচনা আজও হয়। আজও বহু সাধক সাধক মায়ং এ রয়েছেন।এই সমস্ত অভিজ্ঞতা গুরু কৃপা ছাড়া অসম্ভব, এবং সর্বোপরি মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব নয়। আপনারাও নিজ নিজ গুরুর চরণ বন্দনা করুন এবং আনন্দে থাকুন। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com