01 Mar সতীপীঠ যোগাদ্য ক্ষেত্রে অলৌকিক কাহিনী
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
দীর্ঘদিন ধরে গুরু কৃপায় দেবীর একান্ন পীঠে হোম, পূজা করে আসতে পারছি। শ্রীনাথ কৃপা করে চলেছেন অহেতুক, তাই এটা সম্ভব হচ্ছে। বহু ভক্তের শুভফল মা আমার হাত দিয়ে প্রদান করছেন এও কম সৌভাগ্যের নয়। আজ অবধি যে যে পীঠ বা ক্ষেত্রে গিয়েছি সেখানেই কিছু না কিছু লীলার সাক্ষী থেকেছি আমি এবং আমার শিষ্য ভক্তরা, যার কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি নেই কারোর কাছেই। ওই বিজ্ঞানের পূজারীরাও একটা সময় বলে থাকেন যে, মীরাক্কেলের ওপর ভরসা রাখুন, দেবতার ওপর ভরসা রাখুন। অর্থাৎ তারাও কোথাও গিয়ে স্বীকার করে নেন যে সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার বলে কিছু একটা রয়েছে, যার জেরে অসাধ্য সাধন হয়।
আমার কাছে লক্ষ লক্ষ ভক্ত আসেন তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, আর মায়ের কৃপায় সেই সমস্যা থেকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তিও পেয়ে যান, সবই আমার আরাধ্য নাথ যোগী সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংসের কৃপা এবং আমার প্রতি আমার গুরুদের অহেতুক আশীর্বাদ বলেই মনে করি। আমি সাধারনত ভক্তদের সমস্যা সমাধান করতে শ্মশান ক্ষেত্রে নিয়ে যাই না, নিয়ে যাই মায়ের দরবারে, পীঠক্ষেত্রে। এবার আপনার বলতেই পারেন শ্মশানেই তো দেবীর বাসভূমি, আমি আপনাকে বলছি আপনার আজ থেকে শ্মশানে যাওয়ার দরকার নেই, আপনি নিজের অন্তরকেই শ্মশানে পরিণত করুন, তবেই সেখানে শ্মশানবাসিনী বসবেন। তাছাড়া, মায়ের ক্ষেত্রেও তো শ্মশান রয়েছে, আপনি ভক্তদের এমন কিছু উপকার করুন যাতে মা আপনাকে সেই ক্ষমতা দেন যে আপনি নিজের অন্তরেই শ্মশান বানিয়েছেন।
যাইহোক, বর্ধমানের যোগাদ্যা পীঠ হল একান্ন পীঠের অন্যতম একটি পীঠ। দেবী সতীর ডান পদের বুড়ো আঙুল ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। পুরাকালে বহু সাধকের অন্যতম সাধন ক্ষেত্র ছিল এই যোগাদ্যা ধাম। সম্প্রতি ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে আমি পৌঁছে গেছিলাম মায়ের কাছে, এখানে দেবী ভদ্রকালী রূপে বিরাজমান। স্বয়ং মহীরাবণের হাত থেকে শ্রীরাম এবং লক্ষণকে উদ্ধার করে হনুমানজি এই ক্ষেত্রে মাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই পীঠের তেজ এতটাই প্রকট যে বহু বহু ভক্ত সেই আভাস পেয়েছেন, আগেও পেয়েছেন আর এখনও পাচ্ছেন।
আমি সাধারণত মনে করি যে, সাধন বা পূজন সবসময় নির্জনে করা প্রয়োজন। কারণ, নির্জনতায় তিনি আসেন, তিনি ভক্তদের কৃপা করেন এবং সর্বোপরি ভক্তরাও শান্ত মনে তাঁকে ডাকতে পারেন। এটা আমার বিশ্বাস যে, কাউকে দেখানোর কিছুই নেই, অন্তত আমার তো দেখানোর কিছুই নেই, কারণ সবটাই গুরুর আমি ওই তাঁর কৃপায় চলছি। এমনও হয়েছে যে, এক নামী শ্মশানে হোম করতে বসে এক ঢাক বাদক আমাকে এসে বলেন যে, মহারাজ একটি ঢাক বাজাবো! তা, আমি খুবই অবাক হই যে শ্মশানে হোম করবো আবার ঢাক কিসের? এখানে তো দুর্গা বা কালী পূজা হচ্ছে না। কিংবা বিশেষ কোনো প্রয়োগ পূজাও হচ্ছে না। পরে বুঝতে পারি যে, কিছু নামজাদা তান্ত্রিক নিজের মন্ত্রের ভুল ঢাকতে এই ঢাকের স্বরণ নেন। কারণ, তাদের শ্মশানে হোমের মূল উদ্দেশ্য হল এক গলা কারণ সেবন করা এবং গাঁজা সহ নানান মাদক দ্রব্যের সেবন করা। আমি এমন বহু লোককে দেখেছি যে, হোমের মাঝেই উঠে পড়েছেন আর বসতে পারছেন না এমনকি তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই সঙ্গী এসে হাজির হয়েছেন। এরা কি আদতে মায়ের ভক্ত! এরা কি মায়ের পূজা করে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে পারবেন! প্রশ্নটি সকলের জন্য রইল।
যাইহোক, এদিন পূজায় বসার আগে পীঠের ক্ষেত্রপাল ভৈরবরা নিজেদের মতন ডাকতে শুরু করে, বাকি ভক্তরা বলেন যে, এই চিৎকারে সবটা শুনতে পাব তো! আমার এক শিষ্য বলে যে, দেখবেন পূজা শুরু হলেই সকলে শান্ত। আর ঠিক তাই ঘটল, পূজা শুরুতেই সব শান্ত হয়ে বসে পড়ল, কিছু ভৈরব মায়ের পূজার ক্ষেত্রে আর কিছুজন বাইরে। পূজা যখন চলছে হঠাৎ করে আমার পূজার ঠিক পেছনের দিকে বৃষ্টি আরম্ভ হতে লাগল, বাকি ভক্তরা অবাক হয়ে দেখল যে কোথাও কিছু নেই, বাকি জায়গায় কোনো বৃষ্টির ছায়া অবধি নেই, এখানে বৃষ্টির জল কথা থেকে আসছে। আমার সঙ্গে দক্ষিণ কলকাতা থেকে দুই ভক্ত গিয়েছিলেন, তারা বলতে লাগলেন, “দাদা, দেখুন মাঝের দেবী ঘটটি কেমন মাঝে মাঝে দুলতে লাগছে!” সেই মুহূর্তে বাকি যারা ছিলেন, তারাও লক্ষ্য করলেন যে, সত্যিই তাই, ঠিক যেন মনে হচ্ছে কেউ দোল দিচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় বাকি ঘট দুইটি কিন্তু নিজস্ব স্থানেই রয়েছে। (যদি এমন জোরে দমকা হওয়া দিত, তাহলে দেবীর ঘটটি উল্টে পরে যেত অথবা বাকি দুটি ঘটও সমান তালে দুলতে পারত, কিন্তু তেমনটি কিছুই হয়নি। এর কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি নেই আমার কাছে।)
পূজা তখন প্রায় মধ্য গগনে, এমন সময় আবার ঝড় উঠল, প্রচণ্ড হওয়াতে প্রায় সারা শরীর সকলে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সকলেই যে, নাট মন্দিরে থাকা সবকটি ফ্যানের মধ্যে কেবলমাত্র একটি ফ্যান আপন মনে নিজস্ব গতিতে ঘুরছে। (যদি হওয়ার গতিতেই ঘুরত, তাহলে বাকি ফ্যানগুলি সেই গতিতে ঘুরছে না কেন? আর যদি হওয়ার গতি বাঁধা প্রাপ্ত হবে তাহলে তো কোনো পাঁচিল বা কিছু দেয়াল থাকবে সেখানে। কিন্তু অবাক করা বিষয় নাট মন্দিরে এমন প্রাচীর থাকবে কি করে! এরও কোনো যুক্তি অন্তত আমার কাছে নেই।) এবার কিছুক্ষণ পর যে ফ্যানটি ঘুরছিল, হঠাৎ করে সেটি থেমে যায়। এবার বাকি ফ্যানের মধ্যে ৩টি ফ্যান ঘুরতে থাকে! আমার মায়ের ভক্তরা অবাক হয়ে দেখছে যে কি হচ্ছে এটি! কিছুক্ষণ পর দুটি ফ্যান ঘোড়া বন্ধ করলে মাঝের ফ্যানটি ঘুরতে শুরু করে আবার। এইভাবে চলল বেশ কিছুক্ষণ।
এবার পূজা শেষে শুরু হল হোম প্রয়োগ। হঠাৎ করে লক্ষ্মী পেঁচা (প্রায় একাধিক) গাছে এসে বসে ডাকতে শুরু করল, ক্ষীরদীঘিতে থাকা মাছগুলি লাফাতে শুরু করল, দূর থেকে শিয়াল ডাকতে শুরু করে এবং কিছু ব্যাঙ দূরে বসে থাকে এমন ভাবে যেন তারাও হোম প্রয়োগ দেখছে। আমার ভক্তরা বলছেন যে, মায়ের এমন লীলা আমরা অন্তত সম্মুখে দেখিনি কোনদিন। এই ভাবে মা নিজের অস্তিত্ব বোঝান এটা ভাবলেই মনের মধ্যে এক আনন্দ হয় যা ভাষায় প্রকাশ করার নয়।
হঠাৎ করে, শিব লিঙ্গের মাথায় থাকা পঙ্কজফুলটি মাটিতে পড়ে যায়! (আমাকে আজকের ভাইরাল হওয়া সাধক সাধিকার মতন বলতে হয় না, মা ফুল দে, মা ফুল দাও এই সব অবাস্তব কথাবার্তা। আমাকে দেবী কিংবা দেবতার মাথায় একগাদা ফুল চাপিয়ে তারপর বলতে হয়না মা দাও দাও ফুল দাও মা…..এই সব। তিনি যদি কৃপা করেন তাহলে এমনই করবেন, বুঝেই করবেন।) যাইহোক, পূজা, হোম শেষে আমরা আবার নিজের গন্তব্যে ফিরে আসি। ভক্তরাও ফিরে এলেন একরাশ আনন্দ নিয়ে, যে আনন্দ কোটি টাকা দিয়েও পাওয়া সম্ভব নয়। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
.