25 Feb পীঠের অলৌকিকতা: সম্মুখ উপলব্ধি
~ কলমে অভেদানন্দ নাথ (বগলামুখী মাতৃ মিশন ট্রাস্ট)
মহারাজ দক্ষের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আদিদেব শঙ্করকে বিবাহ করেন দেবী সতী। আর তাতেই রুষ্ট হন মহারাজ। এর প্রতিশোধ নিতেই এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন রাজা দক্ষ। সেখানে সকল দেবগণ সহ দেবীকে আমন্ত্রণ জানালেও, জামাতা শিবকে আমন্ত্রণ জানান না দক্ষ। পতি অপমান মেনে নিতে পারেননি দেবী সতী। আর এই যজ্ঞে গিয়ে যথাযথ সম্মানও পাননি তিনি। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞের আগুনেই নিজেকে আহুতি দেন দেবী।
উল্লেখ্য, দেবী সতীকে এই অবস্থায় দেখে সহ্য করতে পারেন না মহাদেব। দক্ষের যজ্ঞ পণ্ড করে সতীর দেহ নিয়ে শুরু করেন তাণ্ডব। আর তাতেই পৃথিবী রসাতলে যেতে শুরু করলে, তাঁকে শান্ত করতে সুদর্শন চক্র পাঠান জগৎকর্তা শ্রীবিষ্ণু। সেখানেই বিষ্ণু চক্রে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ড হয়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে, সেই স্থানগুলি সতীপীঠ নামে প্রসিদ্ধ।
প্রসঙ্গত, সনাতন হিন্দুদের কাছে এই পীঠগুলি খুবই পবিত্র এবং সদাজাগ্রত। ভারতবর্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কাতেও রয়েছে দেবীর এই পীঠগুলি। তারই মধ্যে এক মাতৃভক্ত দীর্ঘদিন ধরে মায়ের মূলত চারখানি বিশেষ পীঠে পূজা, হোম করে চলেছেন ভক্তের মঙ্গল কামনায়।
সত্যি কথা বলতে, গুরুর নির্দেশেই সেই ভক্ত সাধারণের জন্য এই পূজা করেন। কারণ গুরু বলেছেন, যে কোনো উপায়ে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সেটি ক্রিয়ায় হোক কিংবা সেবায়। তাই তাঁর গুরুর নির্দেশকে মাথায় নিয়ে তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৌঁছে যান এবং ভক্ত সহ তাঁর সঙ্গে ঘটে নানান অলৌকিক ঘটনা, যার কোনো ব্যাখ্যা অন্তত বিজ্ঞান বা কোনো বিষয়ের কাছে নেই। বহু ভক্ত বহুবার লক্ষ্য করেন যে, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কাঠ, কপ্পুর এমনকি বালি অবধি আবারও জ্বলতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, মায়ের সেই ভক্ত পীঠে পৌঁছাতেই ভৈরব, ভৈরবীরা এগিয়ে আসেন তাঁর দিকে, তাকে আলিঙ্গন করেন আবার তাঁর কথা মতন কাজও করেন।
বহুবার এমন ঘটনা বহু ভক্ত লক্ষ্য করেছেন যে, তিনি হোম শেষ করে মায়ের মন্দিরে বসে রয়েছেন, ভৈরব এসে তাঁর বুকে মাথা দিয়ে ঘুমাতে শুরু করেছে ( ভৈরব কিংবা ভৈরবী বুঝতে পারেন সেই শক্তিকে)। তিনি মন্দিরে পৌঁছানো মাত্রই বহু পূজারী এবং বহু সাধক তাঁকে মহারাজ বলে সম্বোধন করেন। এমনকি তাঁরা এও বলেন, আমাদের চিন্তা কি মহারাজ রয়েছেন। তিনিই সঠিক পথ দেখাবেন।
এমন বহুদিন হয়েছে যে, সেই মাতৃ ভক্ত মন্দিরে কিংবা সাধন ক্ষেত্রে পৌঁছানো মাত্রই বাকি সাধকরা তাঁকে দেখতে থাকেন, এমনকি তাঁর পিছন পিছন আসতেও থাকেন। ভক্তরা এর কারণ জিজ্ঞাসা করতে তিনি হেসে বলেন, “আরে, তাঁরা বহু পুরানো সাধক, আমি এসেছি তাই দেখতে এসেছেন। তারাও তো এই পথের পথিক, তারাও তো মায়ের সেবক।” প্রচণ্ড শীতে সাধুরা কষ্ট পেলে তিনি তাঁদের কাছে পৌঁছে দেন গরম পোশাক, খাবার আবার অন্যান্য সামগ্রী।
যাইহোক, অষ্টমীর দিনে ভক্তদের নিয়ে তিনি একান্ন পীঠের অন্যতম একটি পীঠ পৌঁছে গিয়েছেন পূজা এবং হোম করবেন বলে। পূজা শেষে মোটামুটি রাত ৯:৩০ টায় তিনি ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গেলেন মূল মন্দিরে, শুরু হল হোমের জোগাড়। শিষ্যরা একে একে সমস্ত উপাদান তাঁর সামনে এগিয়ে দিলেন, তিনিও আপন মনে কাজ করতে শুরু করলেন। হোম চলছে এমন সময়, হঠাৎ একটি নূপুরের শব্দ ধেয়ে আসতে শুরু করল দূর থেকে! সেইদিন উপস্থিত সকল ভক্তরা সেই শব্দ শুনতে পেলেন এবং কেউ কেউ একটু ভয়ও পেলেন। (এর আগেও এমন হয়েছে যে কথা কোনো বৃহৎ গাছ নেই অথচ কথা থেকে দুটি বৃহৎ শুকনো গাছের পাতা হোম চলাকালীন মূল বেদীতে এসে পড়ল।) আবার এমনও হয়েছে যে সবাই যখন বুঝতে পারেন শব্দটি তখন ধীরে ধীরে শব্দটি উধাও হয়ে যায় আর শুনতে পাওয়া যায় না। যাইহোক, অষ্টমীর হোম যখন বিশেষ ভাবে চলছে, ঠিক সেই সময় শিষ্য এবং সেই মায়ের ভক্ত লক্ষ্য করলেন মায়ের কুণ্ডের পাশ থেকে কেউ হেঁটে বাইরে এলেন এবং তাঁকে একবারই দেখা গেল (এমনও ঘটনা ঘটেছে যে পূর্ণাহুতির পর এক বিশেষ জ্যোতি লক্ষ্য করা গিয়েছে সেই পবিত্র কুণ্ড থেকে, ধীরে ধীরে সেই জ্যোতি নিভে গিয়েছে)। যেমনি সেই ব্যক্তি হেঁটে বেরিয়ে এলেন মায়ের সেই ভক্ত ভেবেছে যে, তিনি হয়তো হোম দেখতে আসবেন, কিন্তু এলেন না। তবে তাঁর পাশে উপস্থিত ভৈরবরা সেইদিকেই তাকিয়ে থাকলেন (আগেই বলেছি যে তাদের বোধশক্তি খুব প্রখর)।
যাইহোক, হোম চলাকালীন আরও ভৈরবের আনাগোনা শুরু হল, দূরের শ্মশানে এলো এক মৃতদেহ (এমন বহুবার হয়েছে যে হোম চলছে কিন্তু মৃতদেহ আসছে না, সেই মুহুর্তে মায়ের সেই ভক্ত বলতে থাকেন আজকে কোনো দেহ এলো না যে! কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃতদেহ আসতে শুরু করে এবং সেই হরিধ্বনি জানান দেয় যে মা আছেন, ব্রহ্ম স্বরূপা তিনি রয়েছেন)। অষ্টমীর পূণ্য তিথিতে একদিকে মহামায়ার প্রয়োগ চলছে একদিকে শান্তিতে মায়ের কোলে ঘুমাতে গেলেন একজন। এইভাবে দীর্ঘক্ষণ চলতে লাগল হোম।
এবার হঠাৎ করেই এক ভৈরবী উপস্থিত হলেন যজ্ঞের সামনে এবং এক দৃষ্টিতে মায়ের সেই ভক্তের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভক্ত তাকে বলেন, “মা, বসো। শান্ত হও, আমি কাজগুলি করে নি।” আর অদ্ভুত ভাবে সেই বাকি ভক্তরাও দেখতে থাকেন যে, ভৈরবীও শুনছেন তার কথা একভাবে। হঠাৎ কিছুক্ষণ পর তিনি এগিয়ে আসেন ভক্তের দিকে। ভক্ত আবার বলেন, “মা, আমি আসন পেতে দিচ্ছি, তুমি এখানে এসে বসো।” আর ভৈরবীও সেখানেই আসনের ওপর বসে পড়ল, সঙ্গে তার দুই সন্তান। যেন মনে হচ্ছে মা তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে বসলেন ভক্তের পাশে, তাকে সাহস জোগাতে, তাকে শক্তি দিতে এবং সর্বোপরি তার সমস্ত ক্রিয়া সফল করতে।
হঠাৎ করে সেই নূপুরের শব্দ থেমে গেল, শুনশান পীঠে হোম চলতে লাগল। ভক্তরা মায়ের নাম করতে লাগলেন এবং মায়ের সেই ভক্ত গুরুর নাম করতে করতে হোম করলেন। হোম শেষ হল, মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে আরো আরো ভৈরব, ভৈরবী। তাদের প্রসাদ খাইয়ে তারা আনন্দে ঘুমাতে গেল আর বাকি ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে তিনিও এসে গেলেন গন্তব্যে।
দেখুন, মায়ের সেই ভক্তকে দেখে বহু সাধক এমনকি বহু অঘোরী সাধু বলেন, “আপনি যা যা বলেন তা একেবারে সত্য কথা, আপনার সমস্ত কথা আমরা শুনি, ভাবি। আপনি ভালো আছেন তো মহারাজ।” শুধু তাই নয় সমগ্র পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায় তাঁর পূজা, হোম শুরু হলে, আবার সমস্ত জীবের সঙ্গে তিনি কথা বলেন আর তারাও সেটা বুঝতে পারেন। এর কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি অন্তত আমি পাই না। এর কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তিও নেই বলেই আমার বিশ্বাস, আছে শুধু পারমার্থিক শান্তি, পারমার্থিক কৃপা।
পরিশেষে সেই মায়ের ভক্ত হলেন আমার গুরু শ্রীনাথ কূলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ
পীঠের নাম: সতীপীঠ কঙ্কালীতলা