15 Feb শিবযোগে বিশেষ অহেতুকী কৃপা সোমানন্দকে
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
পরমপুরুষ সচ্চিদানন্দ মঙ্গলময় ব্রহ্মস্বরূপ হলেন শিব। এই সমগ্র জগতই শিবময়। জগতের সমস্ত জীব থেকে শুরু করে যে কোনো বস্তুই শিবময়। তিনিই নিত্য, তিনিই একাধারে সমস্ত দেবের মূল। তাই তাঁকে আলাদা করে সৃষ্টি বা পালন করতে হয় না, বরং তাঁর নির্দেশেই শিব স্বরূপ ব্রহ্মা জগৎ সৃষ্টি করেন এবং পরমশৈব শ্রীবিষ্ণু জগতকে পালন করেন। আর সবশেষে সর্বোপরি তিনিই রুদ্ররূপ নিয়ে ধ্বংস করেন। জগতের এটাই সত্য বাক্য যে, ব্রহ্মের প্রতিটি বস্তুর কিংবা জীবের সৃষ্টি যেমন রয়েছে তেমনই তার সংহারও অবশ্যম্ভাবী।
প্রসঙ্গত, শিব’ই জগতের আদিতে যেমন বিরাজমান ঠিক তেমনই শেষেও বিরাজমান। তাই শিবযোগ শুরু হয় এই শিবরাত্রির সময়। শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, এই তিথিতেই শিব-পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং আশুতোষ ধরণীতে লিঙ্গরূপে বিরাজমান হন। তাই এই তিথিকে শাস্ত্র মহাতিথি বলে উল্লেখ করছে।
উল্লেখ্য, শিব পূজায় অখণ্ড পাঁচটি ফল (পাকা আম, কলা, বেল বিশেষ ভাবে প্রয়োজনীয়) নিবেদন করলে বিশেষ ফল পায় ভক্তরা। আবার এই পূজায় দুটি উপকরণ অপরিহার্য, একটি হল আকন্দ ফুল (যাকে শাস্ত্রে অর্কপুষ্প বলে উল্লেখ করা হয়) এবং নিখুঁত পাঁচটি বেলপাতা (শিবের পাঁচ মস্তকের জন্য প্রয়োজন)। আমি ছোট থেকেই শিবপূজা করি। প্রথম প্রথম সংক্ষিপ্ত আকারে পূজা করলেও বর্তমানে গুরু কৃপায় এই উৎসব বেশ সাড়ম্বরেই করবার সুযোগ পাই।
বলাবাহুল্য, আজ অবধি যা অহেতুকী কৃপা পেয়েছি সেসবই গুরুর কৃপায়। সম্প্রতি ত্রিপুরায় কালীপূজার দিন শিষ্য সৃজন আমাকে বলে, “বাবা এটি তোমার জন্য!” আমি দেখলাম একটি রুদ্রাক্ষ, তবে এর বিশেষত্ব হল রুদ্রাক্ষে ত্রিশূল এবং শিবলিঙ্গ রয়েছে (এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত এবং দুর্মূল্য একটি উপাদান, বর্তমানে এমন জিনিস প্রায় মেলেই না)। আমি ভাবলাম শিব হয়তো কৃপা করছেন, তারপর আরও এক শিষ্য মনোপ্রিয় আমার কাছে এসে বলল, বাবা, হাতটা পাতুন একটু, বলেই হাতে দুটি রুদ্রাক্ষ দিল। এই রুদ্রাক্ষের বৈশিষ্ট্য হল, বেলপত্রের মতন আকৃতি একটি এবং আরো একটিতে একই রকম ভাবে ত্রিশূল এবং শিবলিঙ্গ রয়েছে। (আমার কাছের শিষ্য অর্জুনানন্দের কাছে একটি রুদ্রাক্ষ দিয়েছি সেবার জন্য)। মনে একটা দারুন আনন্দ হতে লাগল যে, শিবযোগে কৃপা করছেন মহেশ্বর।
আজ শিবরাত্রি, অর্ধাঙ্গিনীকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম বেশ কয়েকটি উপাদান সংগ্রহ করতে। হঠাৎ অর্ধাঙ্গিনীর দাবি যে কালীঘাট মন্দিরের কাছেই সেই উপাদানগুলো পাওয়া সম্ভব। একসঙ্গে পৌঁছে গেলাম বঙ্গের অধিশ্বরীর মন্দির চত্বরে। সব বাজার শেষে বাড়ির পথে আসতে গিয়ে বললাম, “চলো, নকুলেশ্বর ভৈরব বাবাকে দর্শন করে যাই, ভিড় থাকলে বাইরে থেকেই দর্শন করবো।” মন্দিরের সামনে পৌঁছাতে দেখি একদমই ফাঁকা। দুজনেই প্রবেশ করলাম নকুলেশ্বর মন্দিরে, মনে হল শিবযোগে এসেছি আশুতোষের মাথায় জল ঢালবো না! সঙ্গে সঙ্গে অর্ধাঙ্গিনী নিয়ে এসে গেল জল এবং বেলপাতা। মনে অফুরন্ত আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছি জল ঢালবো বলে। এমন সময়ই ঘটল এক ঘটনা।
আমার সামনের এক ভক্ত দীর্ঘক্ষণ সামাজিক মাধ্যমে লাইভ দেখাচ্ছেন কখনও বাড়ির লোকের সঙ্গে এই মুহূর্ত শেয়ার করছেন, আমি পিছনে অপেক্ষা করছি কখন বাবার মাথায় জল ঢালবো। হঠাৎ পুরোহিত বলে উঠলেন, ” এখুনি বাইরে যাও তোমরা, ফোন বন্ধ করো না হলে পুলিশ ডাকবো। দীর্ঘক্ষণ দেখে যাচ্ছি এই সব, দামী ফোন কিনেছো তারপর থানায় গিয়ে ফোন ফেরত পেতে হবে। যাও এখুনি।” এমন ভাবে বললেন মনে হল যে স্বয়ং তিনিই এই বকা দিয়ে তাদের জাগতিক নেশা ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন এবং মন্দির থেকে বাইরে বের করে দিলেন রীতিমত।
যাইহোক, পূজারী বললেন, আসুন জল ঢালুন বাবার মাথায়। একদম পরম শান্তি পেলাম কলকাতা তথা বঙ্গের মালিকের মাথায় জল অভিষেক করে। শিবরাত্রির শিবযোগ শুরুই হল বিশেষ কৃপা পেয়ে। দুজনেই অপার আনন্দ পেলাম এই সুযোগ যে তিনি করে দিলেন আমাদের।
বাড়ির ফেরার পথে এই আলোচনা করতে করতে আসছি, হঠাৎ দেখি একজন শান্তিতে যাচ্ছেন মায়ের চরণ পেতে। এটাও কোথাও শুভ ইঙ্গিত বহন করে নিয়ে এলো যে শিবময় জগতে আমরা সঠিক পথেই রয়েছি, তাই গুরু কৃপা করছেন সঙ্গে দেবতারাও। আপনারাও সঠিক পথে থাকুন, শিবপূজায় রত হন সকলে। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।