নতুন বছরে যোগাদ্যা দর্শন, কোথায় এই সতীপীঠ - Somanandanath
16664
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16664,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

নতুন বছরে যোগাদ্যা দর্শন, কোথায় এই সতীপীঠ

নতুন বছরে যোগাদ্যা দর্শন, কোথায় এই সতীপীঠ

~ কলমে সোমানন্দ নাথ

বছরের শুরুতেই প্রথমে একান্ন পীঠের অন্যতম বিষ্ণুক্রান্তায় কালীকুলের অধিশ্বরী দেবী কালিকার কাছে পূজার পর, পৌঁছে গেছিলাম বোলপুর কঙ্কালীতলা সতীপীঠ ক্ষেত্রে। সেই পীঠ শেষে এবার এসে পৌঁছালাম একান্ন সতীপীঠের আরও এক প্রধান পীঠ, দেবী যোগাদ্যার, বর্ধমান জেলার অন্তর্গত, মঙ্গলকোট থাকার অধিনস্ত ক্ষীরগ্রাম।

এই পীঠের ইতিহাস দীর্ঘদিনের, বহু কবি তাঁর গ্রন্থে এই পীঠের উল্লেখ করেছেন। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই পীঠের উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া ভারত চন্দ্র তাঁর “অন্নদামঙ্গলে” উল্লেখ করছেন:

“ক্ষীরগ্রামে ডানি পার অঙ্গুষ্ঠ বৈভব‌‌।
যুগাদ্যা দেবতা ক্ষীরখন্ডক ভৈরব।।”

প্রসঙ্গত, দেবী যোগাদ্যাকে নিয়ে যতগুলো উল্লেখ বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে দেখতে পাওয়া যায়, সেই লেখকবর্গ সকলেই ক্ষীরগ্রামের বাসিন্দা নন, মূলত দেবীর মহিমায় আকর্ষিত হয়ে তারা বন্দনা করেছেন তাঁর।
উল্লেখ্য, কুব্জিকা তন্ত্র, বৃহন্নীল তন্ত্র, মহাপীঠ নিরুপণম ইত্যাদি গ্রন্থে ক্ষীরগ্রামের উল্লেখ রয়েছে। বৃহন্নীল তন্ত্রে এই অঞ্চলকে বলা হয়েছে ক্ষিরপুর। মহাপীঠ নিরূপণমে উল্লেখ রয়েছে ক্ষীরিকা নামে। কথিত রয়েছে যে, ক্ষীরগ্রামে দেবীর দক্ষিণ পদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পতিত হয়েছিল। এই পীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী যোগাদ্যা বা ভূতধাত্রী এবং ভৈরব ক্ষীরকন্ঠক। ক্ষীরগ্রামের ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সুবিশাল এক দিঘির পরিচয় হবে, যার নাম ক্ষীরদিঘি। আর তার কিছুদূরেই মায়ের দুই মন্দির।‌ প্রথমটি হল দেবীর আদি মন্দির (লাল রঙের), এখানে বিশেষ সময়ে মায়ের আদি বিগ্রহ রত্নবেদীতে অধিষ্ঠান করেন। আর এই মন্দিরের কিছুদূরে রয়েছে মায়ের আরও এক মন্দির। নব্যনির্মিত জল মন্দির।

প্রসঙ্গত, প্রতিবার বৈশাখ সংক্রান্তিতে দেবীর মহাপূজা, সেই দিন এবং বছরের আরও চারদিন (বিজয়া দশমী তিথি, অক্ষয় নবমী, ১৫ পৌষ) দেবীকে জল থেকে তুলে বাইরে নিয়ে আসা হয়। তবে সাধারণের জন্য কেবল বৈশাখ সংক্রান্তি এবং ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ দর্শন দেন তিনি। বৈশাখ সংক্রান্তি দিন মা জল মন্দির থেকে তুলে মূল মন্দিরের অনতিদূরেই এক মঞ্চে অবস্থান করানো হয়। ঐদিন ভক্তরা মাকে স্পর্শ করার সুযোগ পায়। এই সময় গ্রামে মহোৎসবকে কেন্দ্র করে বিরাট মেলা বসে। কথিত আছে, তিনি আদিশক্তি, তাই পূজার দিন এত ভক্তের স্পর্শে তাঁর দিব্যঅঙ্গে ‘স্পর্শদোষ’ লাগে, তাই আবার ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ জল থেকে ওঠেন, এই দিন মেলার শেষ দিন, সারাদিন ভক্তদের দর্শন দেওয়ার পর স্পর্শদোষ কাটানোর জন্য দেবীর বিশেষ ‘অভিষেক’ হয়। তারপর মা আবার ফিরে যান। ‌এই দুদিন ছাড়া বছরের বাকি যে দিনগুলিতে মা জল থেকে ওঠেন তখন সাধারণের দর্শনের অনুমতি থাকে না।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে কথিত আছে যে, মহীরাবণের আরাধ্যা দেবী ভদ্রকালী এবং ক্ষীরগ্রামের মা যোগাদ্যা এক। দশানন পুত্র মায়াবী মহিরাবন শ্রীরাম এবং লক্ষণকে মোহিত করে পাতালে বন্দি করে রাখে, তখন বিভীষণের উপদেশে রাম-লক্ষণকে পাতাল থেকে উদ্ধারের জন্য হনুমান দেবী ভদ্রকালীর কাছে গমন করেন। তখন স্বয়ং দেবী মহিরাবনকে বধ করার উপায় হনুমানকে বলে দেন। যুদ্ধ জয় শেষে রাম লক্ষণকে নিয়ে পাতালপুরী ছেড়ে বেরোবার উদ্যোগ করতে দেবী যোগাদ্যা হনুমানকে বলেন,
“সাধিয়া রামের কার্য চলিলা সত্বর,
সেবা কে করিবে মম পাতাল ভিতর।”

অতএব হনুমান দেবীকে পাতাল হতে উদ্ধার করে মস্তকে স্থাপন করে এবং রাম লক্ষণকে দুই কাঁধে বসিয়ে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। এই যাত্রাপথে ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে পরে ক্ষীরগ্রাম। দেবী সেখানেই অধিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। শ্রীরাম,লক্ষণ এবং হনুমান দেবীকে সেখানেই ক্ষীরদীঘির পারে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা নির্মিত এক সুদৃশ্য দেউলে প্রতিষ্ঠা করে বিদায় নেন। ‌
এই আদি মূর্তিই আদি মন্দিরে সারা বছর থাকে। এই মূর্তিকেই আগে সম্বোৎসর ক্ষীরদিঘির জলে ডুবিয়ে রাখা হত, কারণ তিনি পাতাল বাসিনী ভদ্রকালী। ‌ ভূমির ওপরে অধিষ্ঠান করতে তাঁর ঠিক রুচি হয় না। ভক্তদের দর্শন দিতে মাঝেমধ্যে তিনি জল থেকে উঠে আসতেন কিন্তু একবার এই আদিমূর্তি কোনো কারণে হারিয়ে যায়। সেই সময়ে ডাইনহাটের প্রখ্যাত শিল্পী নবীন ভাস্কর, তিনি তৈরি করলেন যোগাদ্যা মায়ের নব বিগ্রহ। সেই সঙ্গে তৈরি হলো জল মন্দির। অনেক বছর পরে ২০০৯ সালে ক্ষীরদীঘি সংস্কারের সময় পাওয়া গেল আদি বিগ্রহ(সেন আমলে তৈরি)। এবার সেই মূর্তি রাখা হল আদি মন্দিরেই। আর সারা বছর জলশয্যায় ডুবে রইল দেবী যোগাদ্যার নববিগ্রহ।
বলাবাহুল্য, তিনি একসময়ে রাক্ষসদের দেবী ছিলেন, প্রথমত বৈশাখের মহাপুজোর সময় দেবী উদ্দেশ্যে এখনও বহু পাঁঠা, মেষ, ছাগবলি হয়। দেবী পুনরায় জলশয্যায় যাবার পূর্বে ‌ একটি আস্ত মহিষের রক্ত খেয়ে তারপর যান। অতীতে মায়ের মন্দিরে নরবলি হত বলেই শোনা যায়। শুধু তাই নয়, এই প্রতি সপ্তাহের শনি, মঙ্গলবার এবং অমাবস্যার দিন নরবলি হত। বিভিন্ন শাস্ত্র বর্ণনা থেকে জানা যায় হনুমান মাকে ক্ষীরগ্রামে প্রতিষ্ঠা করে যাবার পরই এলাকার সামন্ত রাজা হরিদত্তকে দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন নরবলি দিয়ে পূজা চালু করতে। মায়ের মন্দিরে যে পূর্বে কখনো নরবলি হতো তার প্রমাণ মহাপুজোর দিন ব্রহ্মমুহূর্তের পূর্বে যখন মাকে জল থেকে তোলা হয় তখন একজন ডোম মাকে বুক চিরে রক্ত দিয়ে বলে। তাই সহজেই অনুমান করা সম্ভব যে, এটি নরবলির বিকল্প প্রথা ।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে বাকি দিনগুলি অর্থাৎ এক পক্ষকাল দেবীর মন্দিরে সন্ধ্যারতির সময় ঢাকের পরিবর্তে মাদল বাজানো হয়। উল্লেখ্য যে, মাদল রাক্ষস জাতির প্রধান বাদ্য, আর তাই নরবলি মহিষবলির মত অনুষ্ঠানের সময় জোরে জোরে বাদল বাজানোর নিয়ম ছিল।

ক্ষীরগ্রামে মূলত ব্রাহ্মণ, উগ্রক্ষত্রিয়/ আগুরি ,বাগদি , মুচি,গোয়ালা,ডোম ইত্যাদি গোষ্ঠীর বসবাস। এখানে কোন জাত পাতের ভেদাভেদ নেই। ডোমেরা মায়ের নিত্য পূজায় অংশগ্রহণ করে, ঠিক তেমনই গ্রামের বড় সামন্ত এবং দত্ত পরিবার দেবী পূজায় অংশগ্রহণ করেন, সাধারণের দর্শন ব্যতীত অন্যান্য যেসব তিথিগুলিতে দেবীকে জল থেকে তোলা হয় তখন এনারা উপস্থিত থাকেন, সারা বছর দেবীর পুজোয় ঢাক, মাদল যত বাদ্য বাজানো হয় তার বাদকরা বাগদী সম্প্রদায়ের, মহাপুজোর দিন দেবীকে জল থেকে তোলার সময় যে মশাল জ্বালানো হয় সে মশাল তৈরি করেন হাড়িরা।

‌উল্লেখ্য, এই যোগাদ্যা মন্দিরের একটি প্রথা রয়েছে যে,
পৌষ সংক্রান্তি থেকে মাঘ সংক্রান্তি এই একমাস ধরে দেবীর মন্দিরে গভীর রাতে ঢাক বাজানো হয়। বিশেষভাবে কমিটির নির্বাচিত এক ঢাকি চোখে মোটা কাপড় বেঁধে নিজের বাড়ি থেকে ঢাক বাজাতে বাজাতে বাজাতে যোগাদ্যা মন্দিরের দরজার সামনে আসেন। এক পা মন্দিরের ভেতরে এবং এক পা বাইরে রেখে বিশেষ ‌সাতটি তালে সাতবার ঢাক বাজান সারারাত ধরে। কথিত আছে যে, মা সেই ঢাকের তালে ডাকিনী যোগিনীদের সঙ্গে মন্দিরে নৃত্য করেন। সেই ঢাকি অনুভব করতে পারলেও তাঁদের দেখতে পান না। তার গায়ে নাকি চুলের ঝাপটা লাগে, শত সহস্র নুপুরের ছমছম আওয়াজ, নিঃশ্বাসের শব্দ। আবার সকাল হলে ঢাকি বাড়ি ফিরে যান। এই প্রথাটিকে গ্রামের লোক বলেন ‘নিশিঢম্বুল’। নিশিঢম্বুল চলার সময় গ্রামবাসীদের ঘরের বাইরে বেরোনো কিংবা মায়ের মন্দিরের সামনাসামনিও যাওয়া নিষিদ্ধ। কেবল একা ঐ ঢাকি সারারাত চোখ বন্ধ অবস্থায় ঢাক বাজাবেন। ‌

পূর্বে কিছু মানুষ কৌতুহলী হয়ে এই দৃশ্য দেখার দুঃসাহস করে। যার ফল হয়েছিল মর্মান্তিক।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com