দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ, ত্রেতায় শ্রীরাম, আর কলিতে শ্রীরামকৃষ্ণ - Somanandanath
16708
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16708,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ, ত্রেতায় শ্রীরাম, আর কলিতে শ্রীরামকৃষ্ণ

দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ, ত্রেতায় শ্রীরাম, আর কলিতে শ্রীরামকৃষ্ণ

~ কলমে সোমানন্দ নাথ

ভারতের সনাতন হিন্দুধর্মের পাঁচটি প্রধান ধরার অন্যতম শক্তিধারা, অর্থাৎ মা’ই প্রধান সবেতেই। তাই শক্তি উপাসকদের অধিকার থাকে সকল দেব বন্দনার, যা অন্য উপাসকদের সচরাচর থাকে না। তবে, সচল দেবতাদের মধ্যে সকল ধারাই দেখতে পাওয়া যায়, তাঁদের লীলায়। ভারতের তন্ত্র সাধনায় একমাত্র ৬৪টি তন্ত্রে সিদ্ধ ছিলেন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। বলাবাহুল্য, এই উচ্চমার্গীয় সাধক হয়েও ঠাকুরের রক্তবস্ত্র পরা ছবি প্রায় বিরল, নেই বললেই চলে। কিংবা তাঁর নামের আগে তন্ত্র চুরামণি বা তন্ত্র সম্রাট বা বর্তমান সময়ে হাজার হাজার টাইটেল খ্যাত তন্ত্র সাধকের মতন উপাধি তাঁর নামের আগে দেখা যায়না। প্রসঙ্গত, ঠাকুরের লীলা পড়লেই বোঝা যায় তিনি সকলের মধ্যে শাস্ত্রের সহজ সরল ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের মতন সাধারণ ভক্তদের বুঝিয়ে দিতেন সঠিক পথ কোনটি। মূলত, সহজ সরল উপায়ে বর্ণনা করে তিনি বহু জটিল ব্যাখ্যা করে ফেলতেন, সর্বোপরি সাধারণের কাছে তিনি ঠাকুর হয়ে উঠেছিলেন এই কারণেই যে, দেবগণ ভক্তের কাছে সহজ ভাবেই আসেন যদি সেই ডাক খুব সরল এবং আত্মিক হয়।

ঠাকুর বহুবার বলেছেন যে, “মা’কে উপলব্ধি করো নিজ অন্তরে, যদি সেই উপলব্ধি সঠিক করতে পারো তবেই তাঁকে পাবে।” তাঁর মতন ত্যাগী সন্ন্যাসী সমগ্র ভারতে বিরল। তিনি বলতেন, সংসারে থাকবে, কিন্তু কোনকিছু গায়ে মাখবে না, মূলত সংসারী সেজে থাকবে তবেই তোমার জীবন স্বার্থকরূপ পাবে। ব্রহ্ম চেতনাই যে সাধকের সাধনার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, অন্যদিকে মন দিলে সাধনভজন সব নষ্ট।

উল্লেখ্য, ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হলেন অবতারেরও অবতার। কোনো লীলায় তিনিই সচল শিব আবার কোনো লীলায় তিনিই নারায়ণ আবার তিনিই কালী। অর্থাৎ, তিনিই সর্বদেবদেবীর স্বরূপ। বহু সাধারণ মানুষ ঠাকুরকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, যুব সমাজ আপনার কাছে এসে কেন থাকে? তাঁর কারণ হল, যুবদের কাছে তিনি শাস্ত্র এতটা সহজে বুঝিয়ে দিতেন, এছাড়া দেবসেবার প্রকৃত জ্ঞান এবং সর্বোপরি জীবনে সঠিকভাবে চলার পথ বলে দিতেন যুব সমাজকে।

প্রসঙ্গত, শ্রীশ্রীঠাকুরের শক্তি শ্রীশ্রী দেবীসারদা ছিলেন সাক্ষাৎ আদি শক্তিস্বরূপিনী, কোটিব্রহ্মাণ্ডরূপীনি। তিনিই মহাবিদ্যাস্বরূপা যোগমায়া। ঠাকুরের জীবনে শ্রীশ্রীমা এতটাই প্রকট ছিলেন যে যতবার তাঁকে সংসার ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে ঠিক ততবার তিনি সেই কথা মানতে পারেননি। তবে, ঠাকুর গুরু হলেও, শ্রীশ্রীমা হলেন সত্যিকারের মা, এবং এই বিশ্বজননীরূপে শ্রীশ্রীমাকে ঠাকুরই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ফলহরিণী কালিকা পূজার দিন। এর পাশাপাশি, ঠাকুরের ধারার মূল কয়েকজন ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী অভেদানন্দ, স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ (১২জন সন্ন্যাসী পার্ষদদের অন্যতম), নাট্যকার গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, কেশব সেন প্রমুখ। তৎকালীন সময়ে শহর কলকাতার শিক্ষিত সমাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। বিজয়কৃষ্ণ, শশধর পণ্ডিত, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মুধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাধিকা গোস্বামী, আমেরিকার বুথ সাহেব, প্রতাপ মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ ব্যক্তিরা ছুটে আসতেন তাঁর সান্নিধ্য পাবার জন্য। আবার শ্রীশ্রী মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন স্বামী যোগানন্দ, শ্রীশ্রীলক্ষ্মীমা, শ্রীশ্রীগৌরীমা প্রমুখ। তবে, মা যে বিশ্বজননী, তাঁর কাছে সকলের সমাজ মর্যাদা, সমান জায়গা এ বহুবার লীলায় দেখিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে আমার পারিবারিক এবং গুরু পরম্পরায় বেশ কয়েকটি মিল রয়েছে। আমার পরিবারের কুলতিলক (বঙ্গের সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশ) স্বামী যোগানন্দ (পূর্বাশ্রমের নাম যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী) ছিলেন বারোজন সন্ন্যাসীদের মধ্যে অন্যতম। ঠাকুর স্বয়ং তাঁকে ঈশ্বরকোটি আখ্যা দিয়েছেন এবং শ্রীশ্রীমা যোগীন মহারাজকে প্রথম মন্ত্রদীক্ষা দেন, ঠাকুরের আদেশেই। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বহুবার আমাদের দক্ষিণেশ্বরে বাড়িতে গিয়েছেন (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে উল্লেখ রয়েছে) এবং সেখানে ভাগবত, পুরান শুনতেন। আমাদের দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চমদোল পালন করা হত (বর্তমানে সেই দোল উৎসব এলাকায় একসঙ্গে পালিত হয়)। সেই দোলের দিন শ্রীশ্রীঠাকুর আসতেন এবং আমার বংশের পূর্বপুরুষেরা ঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে তারপর দেববিগ্রহে আবির দিতেন। শ্রীশ্রীঠাকুর এও উল্লেখ করেছেন যে, আমাদের বংশে বহুমানুষ তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং তিনি যে বাড়িটিতে যেতেন সেই বাড়ির অস্তিত্ব এখনও বর্তমান।

উল্লেখ্য, আমার গুরু পরম্পরায় শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হলেন পরাপরগুরুদেব। অর্থাৎ, আমার আরাধ্য (পরমগুরুদেব নাথ যোগী সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংস) গুরুদেবকে পুরীর সমুদ্র নিকটবর্তী শ্মশানে যোগে দীক্ষা দিয়েছিলেন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, শ্রীশ্রী বামাক্ষেপা বাবা এবং শ্রীশ্রী তৈলঙ্গস্বামী। তাই সেই দিকে শ্রীশ্রীঠাকুর আমার পরাপরগুরুদেব। তাই শ্রীশ্রী ঠাকুরের জন্মতিথি উপলক্ষে তাঁর শ্রীচরণে শতকোটি নমস্কার জানাই এবং প্রার্থনা জানাই যে আমিও যে গুরুচরণ লাভ করতে পারি। আমি যে সারা ভারত নাথ যোগী সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব বাবাকে প্রচার করতে পারি, তাঁর বাণী, তাঁর অপূর্ণ কাজগুলি যেন সম্পূর্ণ করতে পারি। আর গুরুদেব বলেছিলেন, পরের জন্মে কোনো জীব হওয়ার ইচ্ছে নেই, যেন শ্রীশ্রীমায়ের চরণের হলুদ ফুল হতে পারি। জয় মা। জয় গুরু

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com