19 Nov এ এক অন্য চতুর্দশী
কলমে সোমানন্দ নাথ
আচার্য, বগলামুখী মাতৃ মিশন
জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে করতে মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠে, ঠিক সেই সময় দরকার হয় সেই পারমার্থিক শান্তি যেখানে গিয়ে মানুষ নিজের দম বন্ধ করা জীবনে কিছুটা মুক্ত বাতাস পায়। আর যারা সারাদিনই মহামায়ার শ্রীচরণে রয়েছেন তাঁদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের কাছে আবার এই শান্তির অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা, তারা চায় মূলত ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে পরমাত্মায় বিলীন হতে। ঠিক যেমন তারাপীঠ ভৈরব শিবাবতার শ্রীমৎ বামদেব বলেছিলেন, “যাবো ব্রহ্মে মিশায়ে….” যেমন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, “এক মনে তাঁকে চিন্তা কর, আর ডাক মাগো….মা……”
এই গোটা জগৎ-ই মায়াময়, আর সেই মায়া সৃষ্টিকারী শক্তি হলেন যোগমায়া, আদিশক্তি স্বরূপীনি “মা”। তবে এই মায়াময় জাগতিক জীবন থেকে সামান্য শান্তি পেতে হলে আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে সেই মায়ের দুয়ারে, যেখানে মা রয়েছেন সমগ্র জগতকে রক্ষা করতে, পালন করতে আর প্রয়োজনে অশুভের সংহার করতে। সাধন পথে যারা দীর্ঘদিন রয়েছেন তাঁরা জানেন যে, শক্তি উপাসনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন কৃষ্ণা চতুর্দশীতিথি। আর সেই চতুর্দশী তিথি যদি মঙ্গলবার এবং তিথির মধ্যরাতে সাধক হোম যজ্ঞ কিংবা তন্ত্রের পূজায় বসে তাহলে তার মাহাত্ম্য আরও আরও বৃদ্ধি পায়। এমনই এক তিথিতে ৫১ পীঠের শেষ পীঠ কঙ্কালীতলায় ভক্তদের নিয়ে উপস্থিত হলেন মায়ের এক চরণাশ্রিত ভক্ত।
ভক্ত দীর্ঘদিন এই পথের পথিক হওয়ায় এমন তিথিতে পীঠ হোমের অভিজ্ঞতা আগেও রয়েছে তাঁর। শুধু তাই নয় এই তিথিগুলিতে শ্মশান হোমের মাহাত্ম্যও আলাদা। যাই হোক, ভক্তরাও একসঙ্গে গিয়েছেন মায়ের মন্দিরে। ঘন অন্ধকার, সঙ্গে শেয়ালের চিৎকার, গোটা অঞ্চল নিস্তব্ধ, পাশের শ্মশানে মরা পুড়ছে, তা দেখে প্রিয়জনদের হাহাকার সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি হয়ে উঠেছে গোটা মন্দির চত্বর। দূরে এক গাছের তলায় একটি প্রদীপের আলো ছাড়া গোটা মন্দিরে ছিটেফোঁটাও আলো নেই। শুরু হল পূজা এবং হোমের জোগাড়।
হঠাৎ উপস্থিত ভক্তের মধ্যে একজন বলে উঠলেন কেউ নূপুর পরে এসেছেন? সকলের থেকে উত্তর এলো ‘না’। তখন পাশের ভক্ত বলছেন কেউ যেন নূপুর পরে হাঁটছেন, কেউ বলছেন ওই কুন্ডের পাশ থেকে আওয়াজ আসছে আবার কেউ বলছেন মন্দিরের ওই হারিকাঠের পাশের আসন থেকে। সেই সময় সেই ভক্ত গাইতে শুরু করলেন “মা আনন্দময়ী নিরানন্দ করুণা……., শেষ করেই ধরলেন কালী কালী বলে রসনা…. এই ভাবে চলতে থাকল বেশ কিছুক্ষন। আর হঠাৎ করে গান শুরু হতেই সেই আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল, মনে হল যেন আবার সেই ঘন অন্ধকারে শুধুই নিস্তব্ধতা। এক ভক্ত বলে উঠলেন, “মা হয়তো আপনার গান শুনবেন বলেই এসেছিলেন দাদা, আপনি গান শুরু করলেন মাও সেই গান শুনলেন।” উত্তরে সেই ভক্ত বললেন, “খুব সাধারণ মানুষ আমি, মা যদি গান শুনতে চান তাহলে আরও কয়েক লাইন গাইছি মায়ের জন্য।”
শুরু হল পূজা এবং হোম। হোম শুরু হতেই নানান দিক থেকে নানান রকমের শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। পাশের শ্মশানে এলো নতুন এক শবদেহ, পাশাপাশি শিয়ালের চিৎকার আর হোম চলতে চলতে আর এক ভক্ত বলে উঠলেন ওই কুন্ডের জলের মাঝে কেমন একটা গোলাকৃতি প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে এবং মাঝে জল বুদবুদ করে উঠছে। বলাবাহুল্য, ওই কুণ্ডেই নিমজ্জিত রয়েছে মায়ের সতী অংশ এবং পীঠ ভৈরব। তবে সেই ভক্ত নিজের মনে হোম করে চলেছেন আর পাশাপাশি ভক্তরাও সেই হোমে আহুতি দিচ্ছেন। হোম শেষ হল, ভক্তরাও ধীরে ধীরে মন্দিরে প্রণাম সেরে বেরিয়ে এলেন বাইরে। বাইরে এসেই ভক্ত বাকিদের বলে উঠলেন, মা কৃপাময়ী তিনি দয়া করেছেন বলেই এই রাতে হোম সম্পন্ন করতে পারলাম, বাকিটা মায়ের লীলা, মাতৃ নামে মেতে থাকুন সকলে। ভক্তের নাম সোমানন্দ নাথ।
*শিষ্যের করা ভিডিও তুলে ধরলাম আপনাদের সামনে, আপনারাও উপভোগ করার চেষ্টা করুন সেই মুহূর্তের*