21 Dec অমাবস্যার রাত
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যার রাত, তাও আবার বছরের শেষ তিথি, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিমেষের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে গোটা এলাকা, তখন শুধুই নির্জনতা এবং নিস্তব্ধতা ছেয়ে রয়েছে সর্বত্র। অমাবস্যা যেহেতু তাই সন্ধেতেই পূজায় বসেছেন তিনি। আজ মহাবিদ্যার প্রথম রূপ দক্ষিণাকালীর পূর্ণাঙ্গ পূজা সম্পন্ন হবে, তাই দুপুর থেকেই জোরকদমে আয়োজন চলেছে। বাকি ভক্তরা কেউ পূজার জোগাড় করছেন, কেউ প্রদীপ সাজাচ্ছেন আবার কেউ নৈবেদ্যের থালা সাজাচ্ছেন। সন্ধ্যে ৭টা হতেই শুরু হল মূল পূজা। আচমন, পুষ্পশুদ্ধি, কামিনীর ধ্যান থেকে শুরু করে নানান শাস্ত্রীয় বিধি মেনেই চলল পূজা।
পূজা চলাকালীন অন্ধকার আরও ঘনিয়ে এলো, মনে হল মুহূর্তের মধ্যে মহানিশা এসে পৌঁছেছে পূজাস্থলে, সঙ্গে ধুপ ধুনোর গন্ধে ভোরে গিয়েছে গোটা ঘর। একের পর এক ভৈরবের পূজা, যোগিনীবর্গের পূজা সম্পন্ন করার পর শুরু হল বিশেষ পূজা। যত রাত গড়াচ্ছে তত মনে হচ্ছে অমাবস্যার মাহাত্ম্য। মূল পূজা শেষে রাত ১১: ৩০ টায় ভক্ত শিষ্যদের নিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন দেবীর মূল মন্দিরে। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতেই চারিদিক প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় ভোরে উঠেছে, যেন মনে হচ্ছে বছরের শেষ বিশেষ তিথিতে দেব দীপাবলি উৎযাপন হচ্ছে পীঠে।
প্রসঙ্গত, পীঠের পূজারীরা অমাবস্যা থাকায় বিশেষ পূজারও আয়োজন করেছেন, গোটা মন্দির সাজিয়েছেন ফুলের মালা দিয়ে। মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠা করে পূজা চলছে। ঠিক সেই সময় তিনি পাশের এক স্থানে বসে পড়লেন হোমের আয়োজন করতে, জোগাড় করতে এগিয়ে এলেন তাঁর শিষ্যরা। যজ্ঞের আয়োজন শেষে আবারও বিশেষ কিছু মন্ত্র পাঠের পরই হল হোমকুণ্ডে অগ্নি প্রজ্জ্বলন। মুহুর্তের মধ্যে কুণ্ডের আগুন জ্বলে উঠল, শুরু হল বিশেষ তন্ত্রের হোম। প্রথমে ঘী বিলপত্রে হোমের পর, হবণসামগ্রী সহ নানান তন্ত্রের উপাদান দিয়ে দীর্ঘক্ষণ হোম চলল। উল্লেখ্য, এই হোম চলাকালীন কুণ্ডের কাছেই এসে উপস্থিত হল ভৈরবরা, তারাও উপভোগ করতে লাগল পীঠ মাহাত্ম্য।
হঠাৎ এক শিষ্যাকে তিনি বলে উঠলেন, ‘কি রে, যে জিনিসটি আনতে বলেছিলাম, এনেছিস? এনে থাকলে এখনই সেটি আমাকে দে, যজ্ঞে প্রয়োজন রয়েছে।’ এই কথা বলে শিষ্যার দিকে তাকাতেই শিষ্যা হঠাৎ চমকে উঠে বলল, ‘আপনি আমাকে ডাকছিলেন? হোম শুরু থেকেই অদ্ভুত ভাবে আমি ভাবিত হয়ে কেঁদে যাই এবং কেউ যেন আমার হাতের ওপর স্পর্শ করে চলে গিয়েছে। আমি পিছন ফিরে তাকাতে কাউকেই দেখতে পাইনি, তাই চোখ বন্ধ করে মায়ের নাম জপতে শুরু করি।’ গুরুদেবও শিষ্যার মনের কথা বুঝতে পেরে তাকে জপে মনোনিবেশ করতে বলেন, চলতে থাকে তন্ত্রের যজ্ঞ।
যজ্ঞ শেষে গুরুদেব তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দেন জপযজ্ঞের জন্য, শিষ্যরাও কথা মতন মূল মন্দিরে গর্ভগৃহের বন্ধ দরজার বাইরেই শুরু করে দেন জপ যজ্ঞ, আর তাদের মধ্যমণি হয়ে এই গোটা অনুষ্ঠানের পরিচালনা করেন তাদের শ্রীনাথ। অদ্ভুত ভাবে, এই জপের পর্ব শেষে দেখা যায় পীঠের পূজাও সমাপ্ত হয়, দেবীর মঙ্গল ঘট নিয়ে আসা হয় মূল মন্দিরে, সঙ্গে থাকেন পূজারীরা। প্রায় রাত তখন ৩টে বেজে গিয়েছে, শিষ্য ভক্তরা ফিরে আসেন তাদের গন্তব্যে। ফিরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে আধ্যাত্মিক আলোচনা, শাস্ত্রীয় আলোচনা। সেদিনের সেই শেষ অমাবস্যার রাত এতটাই গভীর ছিল, যার উত্তর হয়তো আজও মেলেনা, সবই দেবতার নির্দেশ। সাধকের নাম সোমানন্দ নাথ আর পীঠের নাম কঙ্কালীতলা।
* সেদিনের একটি ছোট্ট ভিডিও শেয়ার করলাম সকলের সঙ্গে।*