01 Mar আমার বংশের দোল উৎসব আজও সাড়ম্বরে পালিত হয়
~ কলমে সোমানন্দ নাথ (শুভদীপ রায় চৌধুরী)
অধ্যক্ষ, বগলামুখী মাতৃ মিশন ট্রাস্ট
সামনেই বাংলা সহ সমগ্র ভারতে দোল উৎসব। এই দোল যাত্রাকে কেন্দ্র করে সনাতন হিন্দুদের বিরাট বিরাট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া চলতি বছর দোলের দিন চন্দ্রগ্রহণ রয়েছে (দুপুর ৩:২০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬:৪৮ মিনিট অবধি)। এবার গ্রহণের স্থিতি প্রায় ৩ঘন্টা ২৮ মিনিট মতন। এই সময় সাধারণ মানুষজন জপ, ধ্যান বেশি করে করবেন, বাড়িতে যে সমস্ত জলের পাত্র রয়েছে সেগুলি পূর্ণ করে রাখবেন। তবে চুটিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন দোলের, রঙে রঙে রঙিন করে দিন চারিদিক।
প্রসঙ্গত, বেশ পুরানো আমল থেকেই বাংলায় শারদীয়া দুর্গোৎসবের মতন দোল উৎসবেরও খ্যাতি ছিল। তার মধ্যে কলকাতার বনেদি বাড়ির এই দোল অনুষ্ঠান খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে হত। বলাবাহুল্য, এই বনেদীয়ানার মাপকাঠি ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মূলত প্রতিটি বাড়ির গৃহদেবতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও সামাজিক বৈভব প্রদর্শনও ছিল দোল উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রচুর লোক সমাগম হত প্রতিটি বিত্তবান্ বাড়ির আঙিনায়। এও শোনা যায় যে, খাওয়া দওয়ায় জন্য ভিয়েন বসে যেত বাড়িতে। তার পাশাপাশি, গান-বাজনার আসর বসত প্রতিটি বাড়িতে। আত্মীয়স্বজন ছাড়াও আশপাশের সাধারণ মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেইসব বনেদি বাড়ির দোলযাত্রা। দোলের উৎসব নিয়ে বিভিন্ন বর্ধিষ্ণু পরিবারগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল কম নয়। সাহেবরা আমন্ত্রিত হতেন অনেক বাড়িতে, থাকত খানাপিনার আসর।
তবে, দিন বদলাচ্ছে, দোলের রমরমাও কমেছে। তবু নিয়মমাফিক দোলের পুজো হয় আজও প্রতিটি বনেদি বাড়িতে। আগের মতন না হলেও লোকজন সমাগম আজও হয়।
দক্ষিণ কলকাতার বড়িশায় সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার, যাদের থেকে কলকাতা, গোবিন্দপুর, সুতানুটি এই তিনটি গ্রামের লিজ বা পাট্টা নিয়েছিলেন চালর্স আয়ার ১৩০০টাকায় বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে ১৬৯৮ সালে। এই পরিবারের দোলউৎসব বহু প্রাচীন। দক্ষিণবঙ্গে বিভিন্ন স্থানে জমিদারি ছিল এঁদের। প্রথমে এই পরিবারের রাজধানী হালিশহরে থাকলেও পরবর্তীকালে নিমতা এবং তারও কিছুপরে বড়িশায় এই রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।
উল্লেখ্য, ১৬৬০ সালে এই বংশের কুলতিলক বিদ্যাধর রায় চৌধুরী কষ্টিপাথরের শ্যামরাই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন হালিশহরে, পরবর্তীকালে জমিদারি পরিচালনার সুবিধার্থে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ চলে আসে কাছারিবাড়ি। এখানকার মন্দিরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পান শ্যামরাই। দোলের সাতদিন পর সপ্তমদোল অনুষ্ঠিত হয় শ্যামরাইকে ঘিরে। পরিবারের মেয়ে-বউরা জড়ো হত মন্দিরে। সারাদিন দোল খেলার পর কাছারির সংলগ্ন দিঘিতে সবাই স্নানে মাতত। রঙে রঙে লাল হয়ে যেত দিঘির জল। সেই থেকে নাম হল লালদিঘি। একবার একদল গোলা সৈন্য ঢুকে পড়ে স্নানের ঘাটে, অসম্মানজনক উক্তি করে মহিলাদের উদ্দেশ্যে। সে সময় সাবর্ণদের নায়েব ছলেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির পিতামহ জন ফিরিঙ্গি। নামকরা লাঠিয়াল ছিলেন তিনি। তিনি দলবল নিয়ে লাঠি হাতে তাড়িয়ে দেন সৈন্যদের। সম্মান রক্ষা হয় মেয়েদের। ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শ্যামরাই বিগ্রহ হালিশহরে। সপ্তমদোল আজ অবধি সেখানেই পালিত হয়।
এর পাশাপাশি, পঞ্চম দোল উৎসবও পালিত হত সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে। সাবর্ণদের দক্ষিণেশ্বরে বাড়িতে (যেই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছেন যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, পরবর্তী কালে যোগীন মহারাজ)। এই পঞ্চম দোলের দিন স্বয়ং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেব আসতেন দক্ষিণেশ্বরের বাড়িতে। রায় চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা সর্বপ্রথম শ্রীশ্রীঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে তারপর বিগ্রহে আবির দিতেন, এই ছিল প্রথা। বর্তমানে এই দোল সর্বজনীন উৎসবে পরিচিত হয়েছে।
১৭১৬সালে সাবর্ণদের জমিদারি পরিচালন কেন্দ্র চলে আসে বড়িশাতে। জমিদার সন্তোষ রায় চৌধুরী বড়িশাতে মন্দির তৈরি করে তাঁর মাতুলালয় থেকে রাধাকান্তদেবের মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সঙ্গে শুরু করেন দোল পূর্ণিমার দোল। সেই থেকে এই পরিবারের তিনটি দোল উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
বড়িশার প্রাচীন আটচালার পাশের মন্দিরে নিত্যপূজিত হন শ্রীরাধাকান্তদেব, আর সঙ্গে থাকেন শ্রীমতী রাধিকা। এখন চার শরিকের ভাগে পালিত হয় দোল। দোলের আগের দিন সন্ধ্যায় দোলচৌকিতে নারায়ণকে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দোলমঞ্চে। নারায়ণের সামনে হয় চাঁচড় পোড়ানো। হোমের আগুন দিয়ে চাঁচড় পোড়ানোই নিয়ম। নারায়ণ ফিরে আসেন মন্দিরে। সবাই মিলে দোলমঞ্চকে প্রদক্ষিণ করেন সাতবার। আতসবাজি পোড়ে, চলে হরিনাম সংকীর্তন। আবির ছোঁড়া হয় দোলমঞ্চ থেকে। পরদিন ভোরবেলা হয় দেবদোল। রাধাকান্ত ও রাধারানির বিগ্রহ নিয়ে পালকি করে আসা হয় দোলমঞ্চে। সারাদিন সেখানেই ঠাকুরকে সবাই আবির দেন। সন্ধ্যাবেলয় আটচালায় ফিরে আসে বিগ্রহ। এরপর তাঁদের স্নান করানো হয় মুসুরডাল বাটা, আমলকী বাটা, চন্দন, টকদই, ডাবের জল, গোলাপজল, জবাকুসুমতেল ইত্যাদি দিয়ে রূপটান মাখানো হয়। পরিষ্কার করা হয় মূর্তি। এরপর নতুন বস্ত্র, সোনার গহনায় রাজবেশ করা হয় ঠাকুরের। রাতে পঞ্চব্যঞ্জন সহযোগে ভোগ হয় ঠাকুরের। পারিবারক হই হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাবর্ণ বাড়ির দোলযাত্রা।