স্বামী যোগানন্দ মহারাজ - Somanandanath
16753
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16753,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

স্বামী যোগানন্দ মহারাজ

স্বামী যোগানন্দ মহারাজ

~ কলমে সোমানন্দ নাথ

আজ এমন এক মহাপুরুষকে নিয়ে আলোচনা করব যিনি স্বয়ং অর্জুন ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন আমাদের সকলের মা, শ্রীশ্রীসারদাদেবী। যাঁকে নিয়ে আজ আলোচনা করছি তাঁকে স্বয়ং ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ঈশ্বরকোটি বলে উল্লেখ করেছেন, স্বামীজি মহারাজ বলেছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র কামজিৎ ছিলেন তিনি। তিনি হলেন সংঘ জননী যোগমায়া আদিশক্তিস্বরূপা শ্রীশ্রী সারদা মায়ের প্রথম মন্ত্রশিষ্য তথা ঠাকুরের ১২জন সন্ন্যাসী পার্ষদের অন্যতম স্বামী যোগানন্দ (পারিবারিক নাম শ্রী যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী)। আজ যোগীন মহারাজের শুভ আবির্ভাব তিথি। তিনি আমার বংশের সুসন্তান ছিলেন, বলাবাহুল্য আমার বংশে এই সাধনমার্গে অতীতে বহু বংশধর এসেছেন। শুধু তাই নয়, এই তন্ত্রে আগে বহু পূর্বপুরুষেরা এসেছেন, সমগ্র ভারতে বিচরণ করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে। আজ তাঁদের মধ্যেই এক সুতিলক যোগীন মহারাজের সম্পর্কে কিছু লিখতেই ইচ্ছে হল। অবশ্যই এই লেখা লিখতে সাহায্য করেছে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা’ গ্রন্থ, আমার বংশের কিছু মৌখিক ইতিহাস এবং ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ গ্রন্থ ইত্যাদি।

প্রসঙ্গত, ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যোগানন্দজীকে দেখিয়ে বাকি সকল ভক্তকে বলেছিলেন, “এরা দক্ষিণেশ্বরের সাবর্ণ রায় চৌধুরী। এঁদের প্রতাপে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। আমি এঁদের বাড়িতে যেতাম, ভগবৎ-পুরাণ শুনতাম ইত্যাদি।” বঙ্গের সাবর্ণ পরিবারের ছেলে যোগীন ছোটো থেকেই ঠাকুরের কাছে আসছেন, এবং সেই থেকেই তাঁর প্রতি তিনি মুগ্ধ হন। সম্পন্ন ঘরের এই সন্তান নিজের পরবর্তী জীবন সঁপে দেন কঠোর ত্যাগ তপস্যা ও তিতিক্ষায়। ঠাকুরের পার্ষদদের মধ্যে তিনিই প্রথম দেহরক্ষা করেন, মাত্র আটত্রিশ বছর বয়েসে। শ্রীশ্রীমায়ের প্রতি ছিল যোগীন মহারাজের অপার ভক্তিবিশ্বাস। যোগীন মহারাজের শেষশয্যায় স্বামীজী বলেছিলেন, ‘যোগীন, তুই বেঁচে ওঠ, আমি মরি।’ স্বামী নিরঞ্জনানন্দজি বহুবার বলেছেন, ‘যোগীন, তুমি আমাদের মাথার মণি।’

উল্লেখ্য, স্বামী যোগানন্দ খুব অল্প বয়সেই ঠাকুরের দর্শন পেয়েছিলেন। “লীলাপ্রসঙ্গে” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, “প্রথম আগমনদিবসে ঠাকুর ইঁহাকে দেখিয়া এবং ইঁহার পরিচয় পাইয়া বিশেষ প্রীত হইয়াছিলন এবং বুঝিয়াছিলেন, তাঁহার নিকট ধর্মলাভ করিতে আসবে বলিয়া যেসকল ব্যক্তিকে শ্রীশ্রীজগন্মাতা তাঁহাকে বহুপূর্বে দেখাইয়াছিলেন, যোগীন কেবলমাত্র তাহাদের অন্যতম নহেন, কিন্তু যে ছয়জন বিশেষ ব্যক্তিকে ঈশ্বরকোটি বলিয়া জগদম্বার কৃপায় তিনি জানতে পেরেছিলেন, যোগীন তাঁহাদিগেরও অন্যতম। বলাবাহুল্য যে, যিনি উচ্চ প্রশংসার অধিকারী, তিনি অনন্যসাধারণ মহাপুরুষ। কিন্তু তাঁর এই সরল, মহাত্যাগী, কঠোর তপস্বী জীবন স্বামী যোগানন্দকে শুধু রামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের নয়, বরং যে-কোনও সমাজ বা কালের মাথার মণি হিসাবেই চেনে।

তবে কে এই যোগীন মহারাজ? স্বামী যোগানন্দ(পূর্বাশ্রমের নাম যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী) দক্ষিণেশ্বরের সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশে ১৮৬১সালের ৩০এ মার্চ(১২৬৭সালের ১৮ই চৈত্র,শনিবার, ফাল্গুনী কৃষ্ণা চতুর্থীতে) জন্ম হয়। পিতা নবীনচন্দ্র রায় চৌধুরী খুবই নিষ্ঠাবান ধার্মিক ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পূজাতে বেশি সময় দিতেন। যোগীন মহারাজ যখন খুবই ছোট তখন থেকেই পিতা নবীনচন্দ্র আশা করতেন যে, যোগীন বড় হয়ে সংসারের ভার গ্রহণ করবে। কিন্তু ঐরূপ কোন লক্ষণ যোগীনের চরিত্রে দেখা যায়নি। বরং বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভগবানলাভের আকাঙ্ক্ষা তাঁহার মনকে অধিকার করে বসেছিল। তিনি নিজেই বলতেন যে, অতি শৈশবকালে এক অভাবনীয় ভাবনায় তিনি বিভোর থাকতেন।

এরপর, যোগীনের উপনয়ন হয়। এরপর থেকেই তিনি পূজায় অধিক সুযোগ পেয়ে প্রাণে একটা তৃপ্তি অনুভব করতে থাকেন এবং সেই দিকেই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ঐ সময় তিনি রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি পুস্তক পাঠ করতেন। তাছাড়া, তাঁর বাড়িতেও প্রায়ই ভাগবতপাঠ ও কীর্ত্তন হত এবং এই কারণে যোগীন সবসময় একটা ধর্মভাবে বিভোর থাকতেন।
কিছুকাল পর পিতা নবীনচন্দ্র তাঁকে আগড়পাড়া মিশনরী বিদ্যালয়ে ভর্তি করেদিলেন। বিদ্যালয়ে পাঠে নিরত থাকলেও যোগীন প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দির সংলগ্ন উদ্যানের কাছে তাঁর বাড়ি বলে তিনি আসতেন সেখানে। বিশেষতঃ ধর্মপ্রাণ পিতা পুষ্পচয়ন ও গঙ্গাস্নানাদির জন্য প্রতিদিন নিয়ম করে রাসমণির প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে যাতায়াত করতেন।

যাইহোক, শ্রীশ্রীঠাকুরের লীলাসম্বরণের পক্ষকাল পরই শ্রীশ্রীমা বৃন্দাবন যাত্রা করেন। মায়ের সঙ্গে গেলেন যোগীন, লাটু, কালী, গোপাল-মা, লক্ষ্মীদেবী ও নিকুঞ্জদেবী। সকলে পথে বৈদ্যনাথ, কাশীধাম ও অযোধ্যা দর্শন করে বৃন্দাবনে কালাবাবুর কুঞ্জে থাকেন। ঠাকুরের নির্দেশে বৃন্দাবনেই যোগীনকে ইষ্টমন্ত্রে দীক্ষা দেন শ্রীশ্রীসারদা জননী। তখন পর্যন্ত শ্রীশ্রীমা কাউকেই দীক্ষা দেননি। এমনকি দুই-তিন জন ছাড়া ঠাকুরের অপর সন্তানদের সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। প্রথমে ঠাকুরের আদেশকে মনের খেয়াল ভেবে চুপ করে গেলেন কিন্তু পর পর তিনদিন একই ভাবে আদেশ পেয়ে একদিন পূজাকালে ভাবাবেশে যোগীনকে দীক্ষা দেন আদি ব্রহ্মাণ্ডের জননী শ্রীশ্রী মা সারদা।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যোগীন মহারাজের যেমন মাতৃভক্তি ছিল, মায়েরও তেমন সন্তানবাৎসল্য রূপ দেখা গিয়েছে বহুবার। যোগীন সম্পর্কে শ্রীশ্রীমা বলেছিলেন,”যোগীন কৃষ্ণসখা গাণ্ডীবী অর্জুন-ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের জন্য ভগবানের নরলীলার সাথী হয়েছে।” স্নেহপুত্তলি যোগীনের স্মৃতিও ছিল মায়ের নিকট আদরের। স্বামী যোগানন্দ শ্রীশ্রীমাকে একখানি লেপ তৈরী করে দিয়েছিলেন। সেই লেপ ব্যবহারের অযোগ্য হলে এক ভক্ত নতুন খোল দিয়ে লেপটি সংস্কার করতে গেলে, মা বাঁধা দিয়ে বলেছিলেন,”না, লেপটা নিয়ে যেয়ে কাজ নেই। এই লেপ যোগীন দিয়েছিল-দেখলেই যোগীনকে মনে পড়ে।” একবার স্বামী যোগানন্দের দেহত্যাগের পর সারদাজননী বলেছিলেন,”যোগীনের মত আমাকে কেউ ভালবাসত না;” অধিকন্তু সকলকে জানিয়ে দিয়েছিলেন,”আমার ভার কি সকলে নিতে পারে? পারত যোগীন, আর পারে শরৎ।”
১৮৮৭সালে বৃন্দাবন থেকে ফিরে তিনি সন্ন্যাস অবলম্বনপূর্বক যোগানন্দ নাম গ্রহণ করেন। যোগীন মহারাজের তখন সুদীর্ঘ চেহারা এবং শরীর অতি কৃশ। তাঁহার চোখ সম্বন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন-“যেন জগন্নাথের চোখ।” দক্ষিণেশ্বর ও কাশীপুরে তিনি খুব ধ্যান করতেন-চোখ লাল হয়ে যেত; ঠাকুর বলতেন-“অর্জুনের চোখের মতন।” যোগীন যে এতখানি মনপ্রাণ ঢেলে মায়ের সেবা করতে পারতেন তা শুধু তিনি মাকে দীক্ষাগুরু রূপে পেয়েছিলেন বলেই নয়। দীক্ষার আগেও এই সেবা তিনি করতেন মনপ্রাণ ঢেলে। ঠাকুরের লীলাসম্বরণের আগেও শ্রীশ্রীমা যোগীনের উপর গৃহস্থালির অনেক বিষয়ে নির্ভর করতেন। ঠাকুরের শ্যামপুকুরে বসবাসের প্রারম্ভে যোগীন দক্ষিণেশ্বরে মায়ের তত্ত্বাবধান করতেন।

আজ মহারাজের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আমি জানাই শতসহস্র প্রণাম। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com