01 Dec শিবসেবায় সোমানন্দ
শিবসেবায় সোমানন্দ
~ কলমে মাতৃ চরণাশ্রিত সোমানন্দ
জীবসেবার আনন্দেই লুকিয়ে আছে শিবপূজার মাহাত্ম্য। নিজের দেহ মন্দিরকে পূজার পাশাপাশি সবসময় সকলকে সাধ্য মতন সেবা করা দরকার, এমনই শিক্ষা দিয়েছেন আমার পিতা-মাতা এমনকি আমার গুরুদেবরা। আমার আরাধ্য নাথ যোগী শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংসের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আর্ত মানুষের সেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। উত্তরবঙ্গের ফারাবাড়িতে তৈরি করেছিলেন দুস্থ মানুষের চিকিৎসার বেবস্থা, আর্ত মানুষের সেবার জন্য বিদেশ অবধি পৌঁছেছিলেন তাদের সেবা করার অর্থ সংগ্রহের জন্য।
সেই উদ্দেশ্যকে পাথেয় করে আমিও আমার সাধ্য মতন সাধারণ মানুষের সেবার চেষ্টা করে থাকি। কখনও ছোটো শিশুদের যথাসাধ্য পড়াশুনার সামগ্রী তুলে দেওয়া, কখনও আবার তাদের মুখে সামান্য অন্ন তুলে দেওয়া, পূজায় নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া। আবার কখনও দীপাবলির আনন্দ সকলের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমার মায়েদের শাড়ি উপহার দেওয়া।
তবে এবারের ভাবনাটা একেবারেই আলাদা। জন্মদিনের আনন্দ উপভোগ করতে এবার ছুটে গেছিলাম সেই পথের পথিকদের কাছে, যারা সবসময় এই সমাজের কাছে অবহেলিত, লাঞ্ছিত এবং বঞ্চিত। যাদের পাশে দাঁড়ানোর মতন গুটিকয়েক লোক ছাড়া আর কাউকেই তেমন ভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা এই শীতের সময় কম্বল চাপা দিয়ে সুন্দর বিছানায় শুয়ে থাকলেও তাদের গায়ে চাপা দেওয়ার মতন একটা চাদরও থেকে না। এই ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে তারা শুয়ে থাকে রাস্তার মাঝে, আর বিবেক আমাদের মতন মানুষের দিকে তাকে হাসে আর বলে, কি করলি মানুষ হয়ে? নিজের কথা ভাবা আর নিজের কথা বলা ছাড়া আর কিছু করেছিস কি? আর উত্তর এসে, না। তবে সেই সব মানুষের থেকে আমি একটু বরাবরই আলাদা ভাবার চেষ্টা করি। তাই জন্মদিন উপভোগ করলাম সেই মানুষদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে। আর রিটার্ন গিফট হিসেবে নিয়ে এলাম একরাশ আশীর্বাদ, চকলেট, স্নেহের চুম্বন আর অঝোর নয়নে কেঁদে জড়িয়ে ধরা সেই দিদার আশীর্বাদ।
পরিবারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম রাত ৯তার সময় কলকাতার রাস্তায় কোথায় কোথায় সেই মানুষজন আছেন, যাদের একটু মায়ের ভোগ প্রসাদ আর কম্বল তুলে দেবো। তবে এই কম্বল কিনতে এবং এই সমস্ত পরিকল্পনা সফল করতে আমার স্ত্রী, মা, বাবা, পিসি, পিসেমশাই আর ভাইয়ের অবদান বলতেই হবে। ওরা না থাকলে আমি আজকের এই অনাবিল আনন্দ পেতাম ই না।
ঢাকুরিয়া, লেক গার্ডেন্স থেকে শুরু করে, কালীঘাট, রাসবিহারী, হাজরা সমস্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সেই সব মানুষের সঙ্গে দেখা করলাম, আলাপ হল প্রচুর ঠাকুমা, দাদুদের সঙ্গে।
পথে যেতে যেতেই এক দাদুকে দেখলাম শীতের রাতে কাঁপছেন, সঙ্গে সঙ্গে নেমে একটা কম্বল দিতেই এক গাল হাসিতে কম্বল চাপা দিয়ে নিলেন, আর আশীর্বাদ করলেন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমার নিজের দাদুও আমাকে এই ভাবেই ভালোবাসতেন।
এরপর রাস্তায় পথিকদের সঙ্গে আলাপ করতে করতে চারুমার্কেট এলাকায় দুই দিদার সঙ্গে দেখা হল। দেখলাম দুজনেই কি খাচ্ছেন, জিজ্ঞাসা করতেই বললেন ভাত আর ডাল খাচ্ছেন। বসে পড়লাম গল্প করতে, দিলাম মায়ের প্রসাদ আর কম্বল। খুশিতে বলে বসলেন, তোমার অনেক ভালো হোক বাবা এই আশীর্বাদ করি। আমিও বলে বসলাম, একটু মাথায় হাত রাখুন দেখি, সঙ্গে সঙ্গে হাত রেখে যেন বললেন ভালো থাকো বাবা। কি যে শান্তি টা ভাষায় প্রকাশ করার বিষয় নয়।
পথে চলতে চলতে এমন বহু মানুষের সঙ্গে আলাপ হল যাদের সত্যি বলতে কিছু নেই, প্রায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। চতুর্দিক ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছালাম ত্রিধারা অঞ্চলের এক দাদুর কাছে, তিনিও সাধনা করেন দেখে মনে হল। রাস্তায় মশারি খাটিয়ে শুয়ে ছিলেন, ডাক দিতেই উঠে এলেন এবং কথার পর মন্ত্র শোনালেন। আমিও ওনার সঙ্গে বলে উঠলাম-‘ জয় গুরু জয় গুরু জয় গুরু জয়।’ এক মুহূর্তের মধ্যে মনে হল যেন আমার গুরুও সঙ্গে রয়েছেন এই মুহূর্তে।
পূর্ণদাস রোড সংলগ্ন এলাকায় দেখা হল এক শিক্ষিত পথিকের সঙ্গে, তিনি আপন মনে কি বলছিলেন। হঠাৎ তার কাছে পৌঁছাতেই বললেন, কি খাবার এনেছো?? বললাম প্রসাদ, সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ঠিক আছে, টা তুমি কি কোনো সংগঠন থেকে এসেছো? বললাম, না! আমার কাল জন্মদিন তাই কিছু সেবা করবো বলে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে ইংরাজিতে বললেন Happy Birthday, এই নাও তোমার Birthday Gift. বলেই নিজের কাছে থাকা একটা চকলেট আমাকে দিলেন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল এই তো আমার জন্মদিনের সেরা উপহার পেয়ে গেছি, যত্ন করে রেখে দেবো এটা।
গড়িয়াহাট মোর সংলগ্ন এলাকায় বহু পথিক দাদু, দিদার সঙ্গে দেখা হল। এছাড়া দেখা হল এক ভবঘুরের সঙ্গে, তিনি বসে বসে কি ভাবছেন, এমন সময় তার কাছে পৌঁছাতেই তিনি বলেন, কি চাই? বললাম, একটু প্রসাদ ও কম্বল এনেছি। সঙ্গে সঙ্গে হাসতে হাসতে নিয়ে নিলেন আর বললেন, অনেক বড় হও বাবা, কল্যাণ হোক তোমার। এই আশীর্বাদ কজনের ভাগ্যে হয় বলুন তো? তাও আবার জন্মদিনের শুভেচ্ছা বলে কথা!
সারা রাত ঘুরে বেড়িয়েছি পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সেই পথিকদের খোঁজে, মনে হয়েছে আমিও একটা সময় মায়ের মন্দিরের পাশেই কিছু মানুষের থাকার ব্যবস্থা করবো, তাদের ভার নেওয়ার চেষ্টা করবো। বাকিটা মায়ের কৃপা এবং গুরুর আশীর্বাদে। আপনারাও ভালো থাকুন সকলে। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।

