14 Mar সতীপীঠ ফুল্লরা
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
গুরু কৃপায় আজ অবধি যে যে ক্ষেত্রে মা নিয়ে গিয়েছেন সেখানেই কিছু না কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটেই থাকে। সেই ঘটনার সাক্ষী থাকি আমি এবং আমার ভক্ত শিষ্যরা। সেই ঘটনার কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি অন্তত আমার কাছে নেই, সবটাই তাঁর ইচ্ছে। আমরা যারা দেবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি, তারা জানি যে জগতের সমস্ত কিছুই তাঁর নির্দেশিত পথে চলে, তিনি কৃপা করলেই সম্ভব, নচেৎ নয়।
আর আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে, গুরু সঙ্গে থাকলে সমস্ত কিছু পাওয়া সম্ভব, সেটি পারমার্থিক শান্তি হোক, কিংবা সাধক শক্তি কিংবা কোনো জাগতিক সুখ সবই পাওয়া সম্ভব। কারণ, গুরুই পারবেন সেই জাগতিক সুখকে বা মায়াকে বিচ্ছিন্ন করে মায়ের চরণে পৌঁছে দিতে। ভক্ত শিষ্যদের মঙ্গল কামনায় আমি কঙ্কালীতলা, যোগাদ্যা, কালীঘাট, কামাখ্যা, ত্রিপুরা সহ সমস্ত সতীপীঠে হোম, পূজা এবং বিশেষ বিশেষ পূজা প্রয়োগ সম্পন্ন করি। আর সেখানেই দেখি দেবীর অলৌকিক লীলা, আর নিজে অনুভব করি যে মা হয়তো কিছু দেখাবেন বলেই নিয়ে এসেছেন।
যাইহোক, আজ আমার সাধারণত কোনো হোম প্রয়োগের কথা ছিল না। হঠাৎ আমার শিষ্য অর্জুনানন্দ বলে উঠল, চলো মা ফুল্লরার কাছে যাই, অনেকদিন মাকে দেখা হয়নি। বাকি আরও এক শিষ্য রাজি থাকায় তাদের সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গেলাম মায়ের কাছে। প্রসঙ্গত দেবী এখানে জয়দুর্গা রূপেই পূজিতা। এখানে দেবী ফুল্লরার ভৈরব হলেন শ্রীবিশ্বেশ। প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমার দিন এই সতীপীঠে বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত মায়ের কাছে কৃপা পেতে ছুটে আসেন।
আমিও ভক্তদের মঙ্গল কামনায় মায়ের কাছে আসি তাদের উদ্দেশ্যে হোম, পূজা করতে। এবার হোম করার যে সামগ্রী প্রয়োজন হঠাৎ করে দুই শিষ্য সেগুলি জোগাড় করবার চেষ্টা শুরু করেন, আর অদ্ভুত ভাবে সেগুলি জোগাড় হয়েও যায়। মন্দিরের সেবায়েত থেকে শুরু করে আধিকারিকবর্গ বলেন, “আপনি পূজা শুরু করুন, বাকি দিকটা আমরা দেখে নিচ্ছি।” মনে হল মা হয়তো এই কারণে আজকে হঠাৎ করে নিয়ে এলেন। দেবী কখন কাকে কৃপা করবেন তা সত্যিই কারোর জানার কথা নয়, তবে আমার বিশ্বাস তিনি বরাবরই আমাকে রক্ষা করে এসেছেন এবং এখনও তাই করেন। বারবার বুঝিয়ে দেন সকলকে যে তিনি রয়েছেন।
যাইহোক, হোম শুরু হতেই এক ছোট্ট ভৈরব এসে উপস্থিত হল কুণ্ডের সামনে। তার আরও অনেক বন্ধু থাকলেও সেই ছোট্ট সন্তান কিন্তু হোমের সামনে এসে হোম হচ্ছে বা পূজা হচ্ছে সেগুলি লক্ষ্য করতে শুরু করে। আমরা সকলেই দেখি সেই দৃশ্য যে, এক প্রাণী যার কর্মের প্রয়োজন নেই, যার বাকশক্তি নেই কিন্তু অনুভব শক্তি রয়েছে, রয়েছে সেই চৈতন্য তাই সে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে।
হঠাৎ, কিছুক্ষণ পর আমার চারদিকে এবং শিষ্যদের চারদিকে ঘুরতে থাকে আর পরে একটি স্থানে চুপ করে বসে থাকে। মনে হয় যেন সেও বাকি শিষ্যদের মতন বসে হোম দেখছে। হোম চলতে চলতে হঠাৎ করে একটি ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আসতে শুরু করে, মনে হয় এত শান্তি হয়তো আর কোনো কিছুতেই নেই। এই শান্তি একমাত্র মায়ের মন্দিরে রয়েছে, মায়ের শ্রীচরণে রয়েছে।
যাইহোক, হোম শেষ হলে ছোট্ট ভৈরব এবং তার বন্ধুদের প্রসাদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করি। আমার কাছে তাদের জন্য নিয়ে যাওয়া সামান্য খাবারই প্রসাদ সম। কারণ শ্রীশ্রীআনন্দময়ী মা বলেছেন সকলকে প্রসাদভোজী হতে। তাই আমি মনে করি, প্রত্যেক জীবের প্রসাদ খাওয়া উচিত। এবার বাড়ি ফেরার পালা, কিন্তু মা আবারও ডাকলেন মন্দিরে। মন্দিরের পূজারী দিলেন বিশেষ কয়েকটি দ্রব্য, আমি আবারও মায়ের শ্রীচরণে নতমস্তকে প্রণাম জানিয়ে রওনা দিলাম গন্তব্যের দিকে।
বলাবাহুল্য, সবসময়ই অনুভূতি একই থাকে সেটি হল, গুরুকৃপা হি কেবলম। গুরুর কৃপা ছাড়া কিছু সম্ভব নয়। সাধন পথে কিংবা সেবাপথে থাকতে হলে তাঁকে লাগবেই। তিনিই পারবেন সেই অমৃতসম শান্তি পাইয়ে দিতে। আপনারাও নিজ নিজ গুরুর চরণ বন্দনা করুন। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
.