26 Jan জয় গৌর, জয় সীতানাথ
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
আজ এক পূণ্যতিথি, আজই মর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বয়ং শিব, আমাদের আরাধ্য গৌর আনা ঠাকুর শ্রীশ্রী অদ্বৈতাচার্য (যিনি ভক্তমহলে সীতনাথ নামে প্রসিদ্ধ)। তিনি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে আমাদের মাঝে না আনলে আমরা গৌরহরির কৃপা থেকে চিরকালই বঞ্চিত থাকতাম। আমার যিনি বৈষ্ণব আচার্য ছিলেন, তিনিও এই অদ্বৈত বংশের কুলতিলক। পক্ষান্তরে আমরাও শ্রীশ্রী সীতানাথের ঘর হিসাবে বলতে পারি। আজ তাঁর আবির্ভাব তিথিতে আমি শ্রীচরণে ভক্তিপূর্বক শতকোটি প্রণাম জানাই। তাঁর আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে সীতানাথের সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা করলাম, পড়ে দেখবেন সকলে।
প্রসঙ্গত, শ্রীশ্রী কমলাক্ষ ভট্টাচার্য (১৪৩৪–১৫৫৮), যিনি পরবর্তীকালে অদ্বৈতাচার্য নামে পরিচিত, সিলেটের লৌর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কুবের পণ্ডিত (তর্কপঞ্চানন) ছিলেন লৌরের রাজার মন্ত্রী। তবে উল্লেখ্য যে, যাঁর অধীনে তিনি রাজসেবা করতেন, সেই রাজাই একসময় অদ্বৈতের ভক্ত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃষ্ণদাস নামে পরিচিত হন। পরে সেই কৃষ্ণদাসই অদ্বৈতর জীবনী রচনা করেন।
উল্লেখ্য, শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্য একসময় লৌর ত্যাগ করে শান্তিপুরে বসবাস শুরু করেন, আর সেখানেই তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা ক্রমে সমগ্র বৈষ্ণবসমাজে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে মহাপ্রভু শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের জন্মের আগে, মূলত সীতানাথের পরামর্শে, বসুদেব সর্বভৌম তাঁর বৃদ্ধ পিতা মহেশ্বর বিষারদ এবং ভাই বাচস্পতিকে নিয়ে তৎকালীন গৌড়ের মুসলমান অত্যাচার থেকে বাঁচতে পালিয়ে নদীয়া ছেড়ে পুরীতে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। রাজা প্রতাপরুদ্র পরে বসুদেবকে যথাযোগ্য সম্মান দেন। সর্বভৌম ভট্টাচার্য ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতর প্রতি ভক্তি নিবেদন করে রচনা করেন “অদ্বৈত মঞ্জরী”। তখন ওড়িশার সিংহাসনে রাজা প্রতাপরুদ্র। এছাড়াও উল্লেখ্য যে, অদ্বৈত মঞ্জরীর শ্লোকে তিনি শান্তিপুরনাথের চরণে ভক্তি নিবেদন করেন এবং তাঁকে প্রভু চৈতন্যের সঙ্গী এবং তাঁর কর্মযোগের বন্ধন থেকে মুক্তিদাতা হিসেবেই অভিহিত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, সেদিনের শ্রীকমলাক্ষ ভট্টাচার্য বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বা শ্রীহট্টের প্রথম সারির বৈদিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। পরে পিতার সঙ্গে শান্তিপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন বাবলা গ্রামে, যেখানে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত এক চতুষ্পাঠীও ছিল। পিতার মৃত্যুর পর কমলাক্ষ নিজেই সেই চতুষ্পাঠীর আচার্য হন। চতুষ্পাঠীতে পড়ানো হত বেদ, বেদান্ত, ব্যাকরণ ও স্মৃতি। মূলত যেগুলি উপাধি অর্জনের জন্য প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও জ্যোতিষ বিদ্যাও পড়ানো হত সেই চতুষ্পাঠিতে। একদিন, গয়ায় তিনি পিতার পিন্ডদান করতে গেলে সেখানেই সাক্ষাৎ হয় মাধবেন্দ্রপুরীর সঙ্গে। উল্লেখ্য, শ্রীশ্রী মাধবেন্দ্রপুরী ছিলেন মধ্যাচার্য সম্প্রদায়ের এক দণ্ডীস্বামী। তাছাড়া, শ্রীশ্রীমাধবেন্দ্রপুরীর কাছ থেকেই কমলাক্ষ প্রথম ভগবতপুরাণের পরিচয় পান।
উল্লেখ্য, শ্রীশ্রী সীতানাথের দুই সহধর্মিণী, একজন শ্রীদেবী এবং অন্যজন সীতাদেবী। এই দুই দেবীর গর্ভে তাঁর ছয়পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। অদ্বৈতের নাতিরা পরবর্তীকালে শান্তিপুরে দুর্গাপূজার সূচনা করেন। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অদ্বৈত পরিবারকে একটি পঞ্চচূড় রথ এবং আশি বিঘা ব্রহ্মোত্তর জমি দান করেন। আজও শান্তিপুরে শ্রীশ্রীঅদ্বৈতাচার্যের বংশধর বড় গোস্বামী বাড়িতে দুর্গোৎসব পালিত হয়।