07 Nov এক অন্য “কাশী”: দেব দীপাবলি
কলমে সোমানন্দ নাথ
আচার্য, বগলামুখী মাতৃ মিশন
“গুরু কৃপায় সব সম্ভব” এমনই অমোঘ দৈববাণী বলেছিলেন আমার তন্ত্রের আচার্যদেব এবং মন্ত্রগুরুদেব বারবার বলেন ‘গুরুকে পেলে তবেই ইষ্টদেবীকে পাবি’। আর যতদিন যাচ্ছে ততই যেন গুরুবাক্য সত্য বাক্যে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন তন্ত্রের পথে থেকে দেখেছি যে কালীকুলের এই পথ যতটাই কাঁটাযুক্ত আবার গুরু কৃপায় সেই পথ ততটাই সহজ এবং সরল।
গোটা জগতকে রক্ষা করতে রাক্ষস ত্রিপুরাসুরকে বধ করে শিব। এই ভয়ংকর রাক্ষসের উপর বিজয়ের স্মরণে পালিত হয় দেব দীপাবলি। আর ভারতে একমাত্র কাশীধামেই এই উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হয়। এবার ভক্তের মঙ্গল কামনায় গুরুর আদেশ নিয়ে হঠাৎই পৌঁছে গেলাম কাশীতে। কারণ আমার আরাধ্য নাথ যোগী সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংস বলেছেন, “আমাকে খুঁজতে হলে কাশী যেও, মনিকর্ণিকায় খুঁজো আমাকে, তবেই পাবে।” তাই সেই কথা মতন এই বিশেষ তিথিতে ভক্তদের নিয়ে ছুটে গেলাম কাশীতে।
গোটা বারাণসী সেজে ওঠে এই বিশেষ তিথিতে। আর এই তিথিতে ভক্তদের নিয়ে কাশীতে উপস্থিত থাকা, এ গুরু কৃপা ছাড়া কি? গোটা ভারতের সনাতন ধর্মের মানুষজন এই তিথিতে কাশীধামে থাকার চেষ্টা করেন, আর আমি গুরু কৃপায় পৌঁছেও গেলাম কাল ভৈরবের স্থানে। প্রতিবারই কাশীতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু লীলার সাক্ষী থাকি, এবারের ঘটনাগুলি আরও কিছু বিষয়ের সাক্ষী….
কাশীর রক্ষাকর্তা তথা পরিচালনকর্তা হলেন স্বয়ং কালভৈরব। তাঁর থেকে অধিকার নিয়ে কাশী ভ্রমণ করতে হয় এমনকি কাশীর বিভিন্ন ধর্মীয় ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেই মতন আমিও আমার ভক্ত শিষ্যদের নিয়ে কাশীতে পৌঁছেই পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রকে দর্শন করেই চলে গেলাম বাবা কাল ভৈরবের মন্দিরে। ভক্তদের মুখে তখন শুধু “কালভৈরবং ভজে…”, আকাশ বাতাস তখন শুধু ভৈরব বাবার নামে মুখোরিত।
এবারের কাশী যাওয়া একেবারে অন্য অনুভূতি। হঠাৎ করেই ভক্তদের বিশেষ প্রয়োগের কারণে এবং দেব দীপাবলি দেখতে গাড়ি নিয়েই ছুটে গেলাম সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংসের প্রাণের শহর কাশীতে। গুরু কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
বাবা কাল ভৈরবের দর্শনের পর প্রতিবারের মতন এবারও পৌঁছে গেলাম অসি ঘাটে, শুরু হল নৌকায় পঞ্চান্ন ঘাট পরিভ্রমণ। কাশীধামের এই অপরূপ সৌন্দর্য এই ঘাট পরিভ্রমণ এ। প্রতিবারের মতন এবারও একটি ব্যক্তিগত নৌকা ভাড়া নিয়ে গঙ্গায় নৌকায় বসে সমস্ত ঘাট দর্শনের পর নেমে পড়লাম সেই চিরদিনের চেনা মণিকর্ণিকায়, পরম গুরুদেবের কোথায়, “আমাকে খুঁজতে হলে মণিকর্ণিকায় খুঁজো।” বেশ কিছুক্ষণ শ্মশান অনুভূতির পর গন্তব্য বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে ভ্রমণ ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে।
কাশী ক্ষেত্র এমনই এক ক্ষেত্র যেখানে শিব-শক্তির একত্রে বসবাস। বাবা বিশ্বনাথ যেমন রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন মা অন্নপূর্ণা, রয়েছেন সংকটমোচন হনুমান মন্দির, মৃত্যুঞ্জয় শিব মন্দির, চিন্তামণি গণপতি মন্দির, দুর্গা মন্দির সহ বিভিন্ন মন্দির। গুরু কৃপায় যেখানেই যাই না কেন সবেতেই নানান অনুভূতি হয়। বলাবাহুল্য, শুধু আমার একার নয় আমার সঙ্গে যে সমস্ত ভক্ত শিষ্যরা যাত্রা করেন তাদেরই নানান অনুভূতি হয়, এও এক প্রাপ্তি বটে। কারণ গুরু বাসুদেবের কৃপা ছাড়া এই ভাবে নানান স্থানে যাওয়া, সেখানে ভক্তদের মঙ্গল কামনায় ক্রিয়া করা বা নানান অলৌকিক লীলা দেখা সম্ভব? আমার মতে তো না। যাই হোক, মন্দির দর্শন, জপ শেষে আবার ফিরে এলাম আবাসনে। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
…সকালে বিভিন্ন মন্দির দর্শনের পর সন্ধ্যায় (কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্দশীতিথি, মঙ্গলবার) সুবর্ন সুযোগ মিলল গুরুদেবের কৃপায়। গুরু কৃপায় গঙ্গাবক্ষে নৌকায় বিশেষ বগলামুখী হোম সম্পন্ন হল। ভক্তের সমস্ত প্রকারের শত্রু সংহারে জ্বালামুখী প্রয়োগ সম্পন্ন হল কাশীধামে। চতুর্দশী তিথিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতের অন্যতম তীর্থক্ষেত্রে বিশেষ তন্ত্র প্রয়োগ, এ গুরু কৃপা ছাড়া কি?
তবে বিষয়টি খুব অদ্ভুত ভাবেই সম্পন্ন হলো, কাশী যাওয়া যবে থেকে স্থির হয়েছে প্রথম থেকেই মনে ইচ্ছে ছিল যে, নৌকায় হোম সম্পন্ন করার। তবে শিষ্যরা খোঁজ নিয়ে দেখেছিল যে এই উৎসবের মাঝে নৌকায় হোম সম্ভব হবে না, এই শুনে মনটা বড়ই খারাপ হয়ে যায়। তবে যে ভাই আমাকে সকালে ঘাট পরিক্রমা করিয়েছিল, তাকে এই হোমের কথা বলতেই বলল, “একদম, আমি আপনাকে বেবস্থা করে দেবো হোম করার, আপনি শিষ্য ভক্তদের নিয়ে সন্ধ্যায় চলে আসুন!!” সঙ্গে সঙ্গে মনে হল গুরুদেবই হয়তো বেবস্থা করে দিলেন সবটা। তবে এখানেই শেষ নয়, প্রথমে যে নৌকায় হোমের সরঞ্জাম রেডি করছিলাম সেই সময় ওই ভাই বলে বসল, গুরুজী এই ছোট নৌকায় নয়, চলুন আমি আপনাকে সঠিক জায়গায় বড় নৌকায় হোম করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এই সুবর্ণ সুযোগ শুনেই শিষ্য ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে সেই নৌকায় পৌঁছে গেলাম আর বিশেষ হোম সম্পন্ন করলাম।
শেষে একটা কথাই বলবো, গুরু কৃপা থাকলে সব সম্ভব। অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায় তাঁর কৃপায়। আর যে সঠিক পথে থাকে জগজ্জননী তাঁর সঙ্গে থাকেন, এ কথা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে আবারও হল। মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
নিজের ইষ্টকে পেতে হলে সবার আগে ‘গুরু’ শব্দের অর্থ বুঝতে হবে। যে সকল ব্যক্তি গুরুকে ধ্যান, জ্ঞান এবং চিন্তন মনে করেন তাঁরাই কেবলমাত্র তাঁর সন্ধান পান। গুরু কৃপা ছাড়া আমরা আর কি চাইতে পারি বলুন? তিনি কৃপা করলেই তো সব পাওয়া হয়ে গেল। এই যেমন দেব দীপাবলির দিন সকাল বেলায় সেই ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েই একটা চটজলদি নৌকোর বেবস্থা করে দিল। আর আমিও গঙ্গায় নৌকায় শিবের অভিষেক, বিশেষ পূজা সম্পন্ন করলাম। সেই সঙ্গে ভক্তদের মঙ্গল কামনায় বিশেষ দীপদান সম্পন্ন করলাম।
দেব দীপাবলির মতন পূণ্য তিথিতে কাশীর গঙ্গায় নৌকায় বিশেষ পূজার আয়োজন, যা প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু গুরু কৃপায় আমার সেই ভাই এতটাই সাহায্য করেছে যে সমস্ত ভক্ত তার সাক্ষী। শুধু তাই নয়, গোটা পুজোতে সেই ভাইও অংশগ্রহণ করেছেন, এটা কম পাওয়া? গুরু কৃপা ছাড়া কি এসব সম্ভব হতো?? উনি কৃপা না করলে এই লীলা সম্ভব হতো না, এখনও বাকি রয়েছে কাশীক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া বিশেষ লীলার কথা…….
পূর্ণিমার সকালে শিবের বিশেষ পূজা শেষে ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে আবাসনে ফেরার সময় রাতের বেলা গঙ্গায় দেব দীপাবলি দর্শনের জন্য টিকিটের কথা বলতে যেতেই মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ, কেউ বলছেন দশ হাজার(মাথাপিছু) আবার কেউ বলছেন পনেরো হাজার(মাথাপিছু) তাও আবার অনলাইনেই সেই টিকিট দেখতে হবে। আর তার থেকে কম সাত হাজার(মাথাপিছু)। তবে আমরা ভক্ত শিষ্য মিলিয়ে অনেকে থাকায় সম্ভব ছিল না জনপ্রতি এত খরচের। তাই নৌকায় পরিভ্রমণের আশা প্রায় ছেড়ে দিয়ে এমনি হেঁটে ঘাট পরিভ্রমণ করবো বলেই স্থির করলাম।
সেদিন সন্ধ্যায় পৌঁছে গেলাম রাজা হরিশচন্দ্রের ঘাটে, গমগম করছে গোটা কাশীধাম। আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে গোটা বিশ্বনাথ ক্ষেত্র। লক্ষ লক্ষ প্রদীপের আলোয় যেন মনে হচ্ছে স্বয়ং দেবগণ আসবেন এখনই। সেই সময় আমার এক শিষ্যকে এক ভদ্রলোক ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা নৌকায় ভ্রমণ করবেন?? স্বাভাবিক সকালে এত দাম শুনে আমরা আর কথা না বাড়িয়ে শুধু জিজ্ঞাসা করলাম কত প্রনামি? আর সেই লোক জানালো মাত্র ১৫০০ টাকা(জনপ্রতি), আমরা একটু অবাকই হলাম শুনে, কিন্তু নেটওয়ার্ক এতটাই কম যে পেমেন্ট হলো না। আবারও ব্যর্থ হয়ে ঘুরতে লাগলাম হরিশচন্দ্র ঘাট সংলগ্ন শ্মশানে। এবার এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হলো তিনি রীতিমত এই পেমেন্টের বিষয়টি শুনে বললেন, “আমি কি জোর করে আপনার থেকে টাকা নিয়ে নেবো?? আপনি আগে চলুন, টাকার বিষয় পরে ভাববেন।” এক মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো যে কতদিনের চেনা উনি, একদম নিজের লোকের মতন করে নিয়ে গেলেন।
আমরা প্রায় আড়াই ঘণ্টার মতন সময় নৌকায় কাটালাম, দর্শন করলাম কাশীর ৮৪টি ঘাট সেই সঙ্গে নানান গল্প শুনলাম। সেদিন গঙ্গায় হাজারে হাজারে নৌকা, বড় বড় নৌকায় বসে ভক্তরা দীপাবলির আনন্দ উপভোগ করছেন। এক মুহূর্তের জন্য ভাবলাম যে, আমার পাশের জন এই নৌকাতেই ৭হাজার কেউ ১০ হাজার দিয়ে বসেছেন আর গুরু কৃপায় (এতটা অর্থ আমি ব্যয় করতে অক্ষম) আমিও তাদের সঙ্গে সহযাত্রী হয়ে রয়েছি মাত্র ১৫০০ টাকা দিয়ে, সঙ্গে রয়েছেন ভক্তরা। কি অদ্ভুত বিষয়টা নয়?? কোনো যুক্তি দিয়েই এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়, কারণ যেখানে সমস্ত যুক্তিই নিষ্ফল সেখানে সফল গুরু কৃপা।
এবার খুব কমদিনের জন্য কাশী গেছিলাম বলে গঙ্গায় আরতি দর্শনের সুযোগ হচ্ছিল না। সেটাও সম্ভব হয়ে গেল নৌকায় বসে, একেবারে সামনে গিয়ে আরতি দর্শনের সুযোগ হলো, লক্ষ লক্ষ ভক্তরা এদিন যেন দেবতাদের আসার অপেক্ষা করছিলেন, আর আমি খুঁজছিলাম আমার গুরুকে, আমার বাসুদেব বাবাকে। কারণ শিষ্য হিসাবে আমি মনে করি যে, গুরুকে সর্বত্র খোঁজা, তাঁর উপস্থিতি বোঝাই শিষ্যের একমাত্র কাজ। মুহুর্তের মধ্যে পৌঁছে গেলাম বাজির প্রদর্শনীতে। কাশীর এই উৎসবের বাজি যেন অনবদ্য, অপূর্ব এক কথায় এমন বাজির প্রদর্শনী খুব কম রাজ্যেই হয়। তারপরই পৌঁছে গেলাম Light and Sound প্রদর্শনীতে।
এগুলো দেখতে দেখতে সেই নতুন ভাই এসে বললেন, গুরুজী এবার টাওয়ার পাবেন হয়তো বিশ্বনাথের নাম ডেকে পাঠিয়ে দিন। আর সেই প্রনামিও পেয়ে গেলেন তিনি, আমরাও উপভোগ করলাম কাশীর এই উৎসবের আমেজ, দর্শন করলাম প্রতিটি মুহূর্ত, এটি গুরু কৃপা ছাড়া কি?? এটা দেবীর আশীর্বাদ ছাড়া কি?? আমার কাছে তো আর কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি নেই বলা চলে। আর আবাসনে ফেরার সময় সব ভক্তরা মিলে খেলাম কাশীর বেনারসী পান। এখানেও ঘটে গেল এক কাহিনী, যে দোকানে পান খাচ্ছি সেই দোকানের দোকানদার হঠাৎ করে তাদের কাশীর কথা বলতে লাগলেন আর সমস্ত টাকা দিয়ে দেওয়ার পরও আমাকে ৩টি তিনরকমের পান দিয়ে বললেন খেয়ে দেখুন বাবু, পয়সা লাগবে না। সব সময়কি পয়সা দিয়ে সম্পর্কের বিচার হয়? আমি অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকলাম আর ভাবলাম কতটা মানবিক হলে ৩মিনিটের আলাপে উনি আমাকে ভালো সম্পর্কের কথা বলেন… এগুলো আমার গুরুকৃপা ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। আপনারাও নিজ নিজ গুরুকে সম্মান করুন তবেই সব পাবেন। জয় মা।