11 Dec দেবী সারদা’ই মহামায়া বগলামুখী
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
আজ আমাদের পরমপূজ্যা চিদানন্দস্বরূপিণী জগজ্জননী দেবী সারদার পুণ্য আবির্ভাব তিথি। শ্রীশ্রী মায়ের এই তিথিতে তাঁর শ্রীচরণে আমার শতকোটি প্রণাম জানাই। মায়ের গুণাবলি বর্ণনা করবার শক্তি বা সাহস কোনোটাই নেই, তবুও তিনি আমার কাছে দেবী বগলামুখী, তাই সেই উদ্দেশ্যে শ্রীশ্রী মায়ের সামান্য বর্ণনা করতে বসলাম। মহামায়ার কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক এই প্রার্থনা করি।
মায়ের ত্যাগী সন্তানরা কখনও তাঁকে দেবী জগদ্ধাত্রী, কখনও শ্রীদুর্গা আবার কখনও মহাবিদ্যাস্বরূপা বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, তিনি হলেন ব্রহ্মময়ী, যে ভক্ত যে রূপে দেখবেন তিনি সেই রূপেই তাঁর কাছে প্রকট হবেন। তবে আক্ষরিক অর্থে তিনি সকলের “মা”, বহুবার তিনি সে কথা বুঝিয়ে দিয়েছেন ভক্তদের। শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের প্রধান স্বামীজি বলেছিলেন, “মা-ঠাকুরানি সমগ্র ভারতে সেই মহাশক্তিকে জাগ্রত করতে এসেছেন….” আবার মঠের অন্যতম স্বামী প্রেমানন্দজি বলেছিলেন, “শ্রীশ্রীমাকে কে বুঝেছে? কে বুঝতে পারে? তোমরা সীতা, সাবিত্রী, বিষ্ণুপ্রিয়াজি, শ্রীমতী রাধারাণী এঁদের কথা শুনেছ। মা, এঁদের চেয়েও কত উঁচুতে উঠে বসে আছেন।” অর্থাৎ মা আমাদের কাছে জ্যোতির্ময়ীস্বরূপা, তিনি নিত্যা, তিনি অনাদিঅনন্ত শক্তি। তবে, আমি তাঁকে মহাবিদ্যার অষ্টম রূপ মহামায়া বগলামুখী রূপেই কল্পনা করি। তবে এরও একটি যুক্তি রয়েছে, স্বয়ং শ্রীশ্রীমা বলেছিলেন, ‘ঠাকুর শ্রীচরণে লাল ফুল নিতে পছন্দ করেন আর আমি হলুদ ফুল নিতে পছন্দ করি।’
শ্রীশ্রীমা নানান সময় দশমহাবিদ্যার দশরূপই ধারণ করেছিলেন। দেবী বগলার ক্ষেত্রে, ‘……হরিশ এই সময়ে ( ঠাকুরের তিরোভাবের পর) কামারপুকুরে এসে কিছুদিন ছিল। একদিন আমি পাশের বাড়ি থেকে আসছি,বাড়ির ভিতরে যেই ঢুকেছি-ওমনি হরিশ আমার পিছু পিছু ছুটছে। হরিশ তখন ক্ষেপা। পরিবার পাগল করে দিয়েছিল। তখন বাড়িতে কেউ নেই,আমি কোথায় যাই? তাড়াতাড়ি ধানের হামারের চারদিকে ঘুরতে লাগলুম। ও আর কিছুতেই ছাড়ে না। সাতবার ঘুরে আমি আর পারলামনা। তখনই আমি নিজমূর্তি ধরে দাঁড়ালুম | তারপর অর বুকে হাঁটু দিয়ে জিভ টেনে ধরে এমন চড় মারতে লাগলুম যে,ও হাঁপাতে লাগলো। আমার হাতের আঙ্গুল লাল হয়ে গেছিল।” আবার এক কাহিনীতে দেখা যায়, এক ভক্ত স্বামীজির কাছে দীক্ষার জন্য এলে স্বামীজি তাকে বলেছিলেন,”পরে সশরীরে সেই মন্ত্রদাত্রী মূর্তি দেখতে পাবি। তিনি বগলার অবতার ,সরস্বতী মূর্তিতে বর্তমানে আবির্ভূতা। …যখন দেখতে পাবি ,দেখবি উপরে মহাশান্তভাব ,কিন্তু ভিতরে সংহারমূর্তি।”
তবে, দেবী বগলামুখীর আরো দুটি বৈশিষ্ট্য ,তিনি পৃথিবীরূপা -সর্বংসহা |তাঁর ধৈর্য্যের সীমা-পরিসীমা ছিল না। তিনি চৈতন্যদায়িনী, জ্ঞানভক্তিদায়িনী। আবার অন্যদিকে তিনি শত্রুনাশিনী।
উল্লেখ্য, আমার এই শ্রীশ্রীমাকে বগলার সঙ্গে তুলনার কারণ আমার পরমগুরু আমার আরাধ্য নাথ যোগী সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংস। তিনিও শ্রীশ্রীমাকে বগলারূপেই দেখে এসেছেন। সাধক বাসুদেব তাঁর গানেও এই দুই রূপকে মিলিয়ে দিয়েছেন। আবার আমার শ্রীনাথ সাধক দিব্যসুন্দর প্রভু (সাধক বাসুদেব পরমহংসের স্নেহধন্য) একদিন বললেন, ঠাকুরের ষোড়শী পূজা সম্পন্ন হলে তিনি নিজের জপের মালা শ্রীশ্রীমায়ের চরণে সমর্পণ করেছিলেন। সেই পূজার ফলস্বরূপ মা তাঁকে তিনরূপ দর্শন দেন (কালী-তারা-বগলা)।
বলাবাহুল্য, ঠাকুর আমাদের মাকে সরস্বতী বলে উল্লেখ করলেও শ্রীশ্রীমা ছিলেন পরব্রহ্মময়ী। তিনি এতটাই গুপ্ত ছিলেন যে তাঁকে বোঝার মতন ক্ষমতা বা শক্তি কোনোটাই কোনো যুগে আমাদের মধ্যে তৈরিই হবে না। ঠাকুর নিজেও শ্রীমাকে বলেছিলেন যে, আমি আর কতটুকু করতে পারলাম, বাকি সব কাজ তোমাকেই করতে হবে….’
বর্তমান সময়ে দেবী বগলার কৃপা প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। সাধারণের নানান বিপদ থেকে উদ্ধার হোক কিংবা জীব উদ্ধারে দেবী পীতাম্বরীর কৃপা খুবই প্রয়োজন। আর আমার মনে হয়, দেবীর সেই প্রকাশ সম্পূর্ণ হয়েছিল শ্রীশ্রীমায়ের মধ্যে। শ্রীশ্রীমা সারদাই আমাদের কাছে দেবীবগলা রূপ নিয়ে মানব কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন।
গুরুদেবের আদর্শকে মাথায় নিয়ে আমিও বহুদিন থেকেই চেষ্টা করি মায়ের নাম লেখার। তাই শ্রীশ্রীমাকে নিয়েও লিখেছিলাম দুই লাইন, পড়ে দেখবেন সকলে। জয় মা।

