বাহ্যাভ্যন্তর মাঝে তিনিই বিরাজে: আত্ম উপলব্ধি - Somanandanath
16680
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16680,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

বাহ্যাভ্যন্তর মাঝে তিনিই বিরাজে: আত্ম উপলব্ধি

বাহ্যাভ্যন্তর মাঝে তিনিই বিরাজে: আত্ম উপলব্ধি

~ কলমে সোমানন্দ নাথ

(স্থান: হিমাচল
তারিখ: ৩০.০১.২০২৬
সময়: সকাল ০৯:১৯মিনিট)

মনুষ্য দেহই দেব মন্দির, যে মন্দিরের সর্বত্র দেবতা বিরাজমান, বিরাজমান তাঁদের সহচর, সহচরীরা। তাই এই দেহরূপী মন্দিরকে যদি সঠিক উপাচারে (ভক্তি পূর্বক অঞ্জলী, জ্ঞান পূর্বক চেতনা এবং সেবা পূর্বক স্বরণাগতি) পূজা করতে পারি তবেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন এবং কৃপা দৃষ্টি আমাদের ওপর প্রদান করবেন। সাধারণত আমরা তাঁদের সেবা করি কি কারণে? এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, বেশিরভাগ জীব তাঁকে ভজন করেন নিজ উদ্ধার পাবেন বলে, আবার কেউ কেউ ব্রহ্মকে জানতেও তাঁর স্মরণ নেয়। আবার বহুক্ষেত্রে এই জীব জগতের মায়া কাটাতেও তাঁর বন্দনা করে থাকেন অনেকে (যদিও বহুক্ষেত্রে এমন নিদর্শন মেলে না বললেই চলে)। তবে আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ধ্যানে, মনে, জ্ঞানে এবং অবশ্যই নির্জনে তাঁকে পাওয়া, তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার সুযোগ পাওয়া এবং সর্বোপরি পারমার্থিক শান্তি পাওয়া।

প্রত্যেকের ইষ্টদেব/দেবী তাঁদের অন্তরেই বিরাজমান। গুরু সেই পূণ্যবীজ শিষ্যের অন্তরে রোপণ করেন যাতে ইষ্ট পূজায় ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারেন সেই শিষ্য। ঠিক তেমনই, শিষ্যকেও এমন ভাবেই স্মরণ করতে হবে যাতে তার দৃষ্টি যেখানেই যাবে সেখানেই ইষ্টের দর্শন মিলবে। সেটি বাহ্যিক দর্শন হোক কিংবা আভ্যন্তরীণ।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী গুরুই সেই দর্শনের পথ বলে দিতে পারেন, কারণ যিনি নামের মধ্যে বসে থাকা নামীর সন্ধান পেয়েছেন তিনিই তো সেই পথের সন্ধান দিতে পারবেন। যাইহোক, দীর্ঘদিন ক্রিয়া কর্মের মধ্যে থেকে কিছুটা সময় নিজের মতন কাটাব বলে কয়েকজন শিষ্য এবং অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাহাড়ি সুন্দরীর কাছে, তার কোলে সামান্য শান্তি পেতে। তবে অবশ্যই যাঁদের ছাড়া আমার এক মুহুর্তও চলে না তাঁরাও (গুরু ও ইষ্ট) সঙ্গে রয়েছেন।

গন্তব্যে বেরোনোর কয়েকদিন আগে আমার এক শিষ্যা বললেন, ” বাবা, যাচ্ছেন যখন মান্ডি পৌঁছে যাবেন, ওখানে মায়ের পীঠ রয়েছে, দর্শন করে আসবেন।” আমিও খুব আনন্দ পেলাম জেনে যে মায়ের সঙ্গেও দেখা হবে তাহলে। কিন্তু আমি যে সংগঠনের সঙ্গে যাচ্ছি সেখানে এই ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। অগত্যা একটু কষ্টই পেলাম যে, দেখা হয়তো হবে না তাঁর সঙ্গে (যদিও তিনি অন্তরে রয়েছেন, তবুও কোথাও বাহ্যিক ভাবে তাঁকে দেখলে হৃদয় পরিপূর্ণ হয়)।

পৌঁছে গেলাম শিষ্য এবং অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে আমাদের গন্তব্যে। ঘুরে দেখলাম পাহাড়ি সুন্দরীর এলাকা, অনুভব করলাম কত স্নিগ্ধ তাঁর পরশ পাথর, কত শান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে এই সুন্দরী সাধারণের জন্য। কত মানুষ ছুটে আসে তার কাছে কিছু সময় কাটাবে বলে…..। যাইহোক, এবার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার সময় শিষ্য অর্জুনানন্দ হঠাৎ চিৎকার করে বলল, “ওই তো ওই পথে গেলে মায়ের মন্দির পেতাম, যাবে দাদা?” আমি আর কি বলি, মনের মধ্যে জমে থাকা কষ্ট নিয়ে বলতে হল দেখি কোথায় নিয়ে যায়।

বলাবাহুল্য, গন্তব্যে পৌঁছে আরও এক শিষ্য বলল এখানে আরও একটি ক্ষেত্রে মায়ের পীঠ রয়েছে। তাহলে আমরা কয়েকদিনের ট্রিপ অন্য ভাবে বানাবো? আমি একটু অভিমানেই বললাম, ” থাক, ওখানে গেলে বাকিদের গন্তব্যে আশার উদ্দেশ্য হয়তো নাও পূরণ হতে পারে তাছাড়া, আমিও তেমন পোশাক নিয়ে আসিনি কিভাবে যাবো!”

যাইহোক, দুপুরে নিরামিষ খাবার খেয়ে গাড়ি করে পৌঁছে গেলাম মা দুর্গার মন্দিরে। মনে ভাবলাম, যাক এই মায়ের সঙ্গে তো দেখা হবে, এখানেই আমার মাকে খুঁজে নেবো ঠিক। মা দশভুজার কাছে পৌঁছে দাঁড়িয়ে রয়েছি, হঠাৎ শিষ্য চৈতন্যানন্দ বলে উঠল, ” বাবা, এখানে আমাদের মা আছে গো!” আমি তো শুনে অবাক! পৌঁছে দেখি তিনি সাড়ম্বরে বসে রয়েছেন দর্শন দেবেন বলে দেবী দুর্গার সঙ্গে (মা বগলামুখী দেবী দুর্গারই প্রকটরূপ)। পূজা দিয়ে ষষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালাম মাকে। তারপর বেরিয়ে এলাম।

কিন্তু মায়ের কৃপা তখনও শেষ হয়নি যে! আর এক শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরের পরের ফ্লোরে উঠে গেলাম, সেখানে স্বয়ং শ্রীলক্ষ্মী বসে রয়েছেন। দেবীকে প্রণাম জানিয়ে ডানদিকে তাকাতেই দেখলাম সেখানে আমার মাও রয়েছেন, আর সানন্দে দেখছেন আমাকে আর হয়তো বলছেন, “কিরে, দর্শন পেলি তো? নাই বা হল অন্যপীঠ, আমি তো সর্বত্র রয়েছি তোর সঙ্গে, বারবার ডেকে ডেকে আমাকে বিরক্ত করিস কেন?” মাকে দেখে মন ভরে গেল এবং ভাবলাম এই মন্দিরে তাঁর এত পূজা হয় আর আমি জানতামই না যে আমি ঠিক তাঁর কাছেই আসছি।

যাইহোক, বাকি শিষ্যরা মাকে দর্শনের পর বলে উঠল, ” বাবা’ই তো খুঁজে পেয়েছে, বাবা এসেছে মা থাকবে না হয়! বাবা তো সর্বত্র তাঁকে খোঁজে, আর মাও তাঁর সন্তানকে খোঁজে, আবার প্রমাণ হল।” আবার পরের ফ্লোরে উঠলাম, সেখানে স্বয়ং জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর পূজা হচ্ছে, মাকে প্রণাম জানিয়ে একটি স্টলে ঢুকলাম সবাই মিলে। সেখান থেকে মায়ের কয়েকটি জিনিস কিনলাম, এবার বেরিয়ে আসার পালা।

হঠাৎ দেখি আবার তিনিই বসে রয়েছেন চিত্রপটে। আমার এক শিষ্য প্রেমানন্দ বলল, “বাবা, আমরা দেখে এসেছি, তুমি চলো, ওখানে মা আছেন।” আমি মুহূর্তে জন্য ভাবলাম, “এত মনের কথা তুমি বোঝো কি করে? এত কৃপা কেন? আমিও যেমন তোমাকে দেখার জন্য আকুল হয়ে থাকি তুমিও আমাকে দর্শন দেবে বলে বসে থাকো, এত করুণা কেন মা!” যাইহোক, ছুটে গেলাম আবার দর্শন করতে, দেখলাম বসে রয়েছেন তিনি, ভক্তি পূর্বক প্রণাম করে এলাম মাকে।

বাড়িয়ে এসে একটাই অনুভূতি হল, আমার তো ছুটি কাটানো স্বার্থক, কারণ যে কারণে মন খারাপ হয়েছিল মা তাঁর তিনগুণ আনন্দ ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাকে। তিন তিনবার দর্শন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন, তুই যেখানেই যাবি আমাকে পাবি, সেটা বাহ্যিক হোক কিংবা আভ্যন্তরীণ। এটাই গুরু কৃপা, গুরুদেব আমাকে নিজের চরণে ঠাঁই না দিলে আমিও হয়তো মাকে এত কাছ থেকে বোঝার শক্তি পেতাম না।

গুরু কৃপা এমনই! যেখানে গুরু স্বয়ং দায়িত্ব দেন যে, তোর কোনো ভয় নেই, এগিয়ে চল, কে কি বলল, কে কি করল কিছু কানেই দিবি না, মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বাবার কাজে এগিয়ে চল। সেখানে আর কিছুর প্রয়োজন আছে কি? না, নেই। যাইহোক, আমার মা আমার অন্তরেই বিরাজমান। আমার এই দেহের প্রতিটি অনু-পরমাণু, শিরা উপশিরায় তিনি রয়েছেন। কিন্তু তবুও তাকে বাইরে থেকে দেখতেও বড় ভালো লাগে যে, মন হয় মায়ের কাছে আসতে পারলাম, শান্তি পেলাম।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com