কামাখ্যা তীর্থ: এক আত্ম উপলব্ধি - Somanandanath
16351
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16351,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

কামাখ্যা তীর্থ: এক আত্ম উপলব্ধি

কামাখ্যা তীর্থ: এক আত্ম উপলব্ধি

কলমে কূলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ

যে কোন সতীপীঠে ভ্রমণ এবং সেই ভ্রমণকালে দেবী মাহাত্ম্য বর্ণন এবং সাধন করা সকল হিন্দু ধর্মের মানুষজনের করা উচিত বলেই মনে করি। তবে এই সাধন তখনই সার্থকরূপ পাবে যখন সাধক তাঁর দেহমন্দিরকে যথাযথ সেবা করতে পারবেন, অর্থাৎ দেবী তো নিজ অন্তরেই বিরাজমান। আমাদের দেহের ষটচক্র অনুসারে ছয়টি শক্তিচক্রকে জাগিয়ে তুললে তবেই মা আসেন। মূলাধার থেকে শুরু করে আজ্ঞাচক্র অবধি এই চক্রের প্রবাহশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সাধন সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সহস্রার চক্রের কথাও উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে করি। এছাড়া, মানবদেহের চার মূল পদ্মের সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন সাধনের জন্য। আর সাধন সম্পূর্ণ হলে তবেই তাঁর মধ্যে জ্যোতি পরিলক্ষিত হয় এবং তা সাধককে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আর দেহমন্দিরকে পুজোর পর পরিব্রাজকের ভূমিকা পালন করা সবচেয়ে জরুরি বলে আমি মনে করি কারণ প্রতিটি দেবস্থানের মাহাত্ম্য রয়েছে আর সেই স্থানে যদি সাধক নিজ সাধনার অংশ হিসাবে বিশেষ ক্রিয়া করে থাকেন তা আরও ফলপ্রসূ হয়।

আমি প্রথম যখন নীলাচল পর্বতে অবস্থিত মা কামাখ্যার মন্দির দর্শনে পৌঁছাই তখন সেই নীলাচল পাহাড়ে দেবী বগলামুখীর মন্দিরের কাছেই এক আবাসনে থাকার সুযোগ হয়। বলাবাহুল্য, আমার ওই আবাসন থেকে মায়ের মন্দিরের সিঁড়ি শুরু হয়। সেবার মায়ের মন্দিরে একঝলক প্রণাম করেই চলে যাই দেবী কামাক্ষার দর্শনে। আমার বহু পরিচিত ভক্তরা জানিয়েছিলেন যে আপনি মাকে না দেখেই ওই মন্দিরে চলে গেলেন! ফলস্বরূপ দীর্ঘক্ষণ লাইন দিয়ে তবে মন্দিরে পুজো দেবার সুযোগ পেয়েছিলাম সেবার। তারপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা, বলা যায় দেবীর কৃপা থেকে কখনই বঞ্ছিত হই নি, আজও সেই কৃপা পেয়ে চলেছি। সেবার নিজের হাতে আমার মাকে সেবা করবার সুযোগ পেয়েছিলাম (কামাখ্যার বগলামুখী মন্দির), মন্দিরের পূজারি নিজে সেই সুযোগ দেন ও বলেন ” আপনি মায়ের সন্তান, আপনি নিজে মায়ের পুজো করুন। আর এবার থেকে কামাক্ষা এলে আপনি মায়ের কাছে থাকবেন, ভক্তরা আলাদা স্থানে থাকার অনুরোধ করলেও আপনি এখানেই থাকবেন।”

নিজের মনের মতন করে মায়ের সেবা করেছিলাম এবং মাকে ফুল দিয়ে সাজানো, মন্ত্রপাঠ এবং প্রসাদ নিবেদন করে ফিরে এসেছিলাম। এবারও যখন কামাক্ষা পীঠে যাই তখন ঠিক মায়ের মন্দিরের পাশেই (কামাখ্যার বগলামুখী মন্দির) থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। বলা যায়, বহু আবাসনে ঘুরেও জায়গা না পাওয়ায় ঠিক মায়ের মন্দিরের পাশেই থাকার সুযোগ হল। শুধু তাই নয়, ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে এবার কামাক্ষা মন্দিরে হোম যজ্ঞ সম্পন্ন করেছি এবং গোটা নীলাচল পর্বতে মন্দির পরিভ্রমণ করেছি, ভক্তদের নিয়ে। সেদিনই আমার মায়ের কাছে পুজো দেওয়ার পর পরের দিন ( যেখানে কামাখ্যা মন্দিরে টিকিট দিয়ে লাইনে দাঁড়ালেও ২ ঘন্টার কমে গর্ভগৃহে পৌঁছানো সম্ভব নয়, সাধারণ লাইনে তো ৬-৭ ঘন্টা লেগে যায়) মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে মায়ের গর্ভগৃহে পৌঁছে যাই এবং দীর্ঘক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে জপের সুযোগ, পুজো দেওয়ার সুযোগ এবং সবশেষে অন্তরে অফুরাণ আনন্দ নিয়ে আসি।

এবার শুধু মা নয়, তাঁর ভৈরব স্বয়ং বিশেষ কৃপা করেছেন আমায় এবং আমার ভক্তদের। আমরা যখন উমানন্দ ভৈরবের দর্শনে যাই তখন বিকাল ৫টা বাজে। আর ভৈরব মন্দির ভাগীরথীর মাঝখানে সেহেতু লঞ্চে করেই যেতে হয়েছিল আমাদের। মন্দিরে পৌঁছাবার জন্য দীর্ঘ সিঁড়ি পেরিয়ে যেতে হয়েছিল আমাদের। সেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেখতে পাই এক বিক্রেতা ফল বিক্রি করছেন। আর মন্দির দর্শনের পর যখন নীচে নামি তখন এতটাই জলের প্রয়োজন ছিল যে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। আমি আমার শিষ্যকে বলি জলের ব্যবস্থা করতে এবং সেই শিষ্য ওই ফল বিক্রেতার কাছে গিয়ে জলের প্রয়োজনের কথা জানান। আর সেই বিক্রেতা বলেন যে “আমার কাছে জল তেমন নেই তবে এই দুটি ফলের থালা রয়েছে আপনারা তো অনেকজন এই দুটি থালা ভাগ করে খান, কোন পয়সা দিতে হবে না।” আমার এক মুহূর্তের জন্য মনে হল যেন স্বয়ং শিব আমাদের প্রসাদ খাওয়ালেন।

বলাবাহুল্য, আমি যে মন্দির বা পীঠস্থানেই যাই না কেন গুরু কৃপায় সেখানে কিছু না কিছু ঘটতে থাকে। আর সেই ঘটনার সাক্ষি থাকেন আমার শিষ্য ভক্তরা। আমি মনে করি যে, গুরুর আশীর্বাদ ছাড়া এগুলি সম্ভব নয়। দেখুন, ওই ভৈরব মন্দিরে আমরা বদেও বহু যাত্রী তখন ছিলেন তারাও জলের জন্য বলছিলেন সকলকে। কিন্তু সেই বিক্রেতা আমাদের কেন বিনা পয়সায় সেই ফলের দুটি থালা দিয়ে দেবেন। আবার যে মন্দিরে টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়ালেও ২ ঘন্টার আগে দর্শন হয় না, আমরা সকাল ৯ টায় পৌঁছেও মাত্র আধঘন্টার মধ্যে দর্শন করেছি। উপরন্তু যে পূজারি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি আমাদের সাধ্য মতন প্রণামী দিতে বলেছেন, যেখানে পূজারিরা বিভিন্ন প্রণামী চেয়ে থাকেন। তাছাড়া, আমি হোমের আগুন জ্বালাবার পরই হঠাৎ করে ভক্তের ভিড় শুরু হতে থাকে, কিন্তু আমি মন্দিরের একদম গোপন স্থানে হোম করেছি, বরঞ্চ অন্য হোমগুলি মন্দিরের সামনেই হচ্ছিল, সেই হোম ছেড়ে আমার কুণ্ডের সামনে এত ভিড় কিসের। বাধ্য হয়ে সেই মন্দিরের পুলিস তাদের সরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন এত ভিড় হয়ে গিয়েছিল। আমি সবটাই মনে করি গুরুকৃপা এবং সর্বোপরি দেবীর অহেতুকী করুণা। সকলে ভালো থাকুন, মায়ের কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com