24 Dec গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া এক ভক্ত
~ কলমে সোমানন্দ নাথ
সে সময় পুরীর শ্রীক্ষেত্রে চলছে জগন্নাথ মহাপ্রভুর রথযাত্রা উৎসব। আমি এবং আমার সহযাত্রীরা উপস্থিত হয়েছি রথ দর্শন করতে। জীবনে এই প্রথমবার রথে পরিবার ছেড়ে প্রভুকে দেখতে এসেছি। টিকিট কাটার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম এই যাত্রা স্বয়ং মহাপ্রভুর কৃপায় সম্ভব হয়েছে। সাধারণত, পুরীর রথযাত্রার সময় ট্রেনের টিকিট পাওয়া খুবই অসম্ভব, আর সেই সময় একটি বিশেষ ট্রেনের আয়োজন করে সরকার। যেদিন যাত্রা করবো তার ঠিক আগের দিন সকালে টিকিট কনফার্ম হল আমাদের, আমার বাড়ির লোক আমাকে প্রশ্ন করল, তোদের কি ট্রেনের বড় অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে? এই ভাবে এত কম সময়ে টিকিট কনফার্ম হয় কি করে? উত্তরে বললাম, “আমাদের বিশেষ অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, তিনিই এটি করেছেন।” রাতে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে পরের দিন রওনা দিলাম পতিতপাবনকে দেখবো বলে।
প্রথম উৎসব উড়িয়া-গৌড়ীয় মিলন উৎসব। আমরা উপস্থিত হলাম মহাপ্রভুর মন্দিরের দরজার সামনে। দেখলাম বহু বঙ্গীয় গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের ভক্তরা তাঁদের কীর্তন করতে করতে বিশেষ উপাচার আয়োজন করছেন। হঠাৎ, আমি মন্দিরের চূড়ায় লক্ষ্য করলাম, জগন্নাথ এবং আমার ইষ্টদেবী মহামায়া বগলামুখী এক হয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁদের আরতি করছেন আমার আরাধ্য নাথ যোগী সাধক বাসুদেব পরমহংস। মুহুর্তের মধ্যে অনুভব করলাম যে মহাপ্রভুর মধ্যেই তিনি রয়েছেন এবং তাঁর মধ্যেই জগন্নাথের বাস। অর্থাৎ দুজনেই অভিন্ন, যাইহোক এই উৎসব দর্শনের পরে ফিরে এলাম আমাদের আবাসনে(অক্ষয়ধাম)।
এরপর ঝালি উৎসব থেকে শুরু করে গুন্ডিচা মার্জন উৎসব সবই পালন করলাম বাকি সহযাত্রীদের সঙ্গে। গুণ্ডিচা মার্জনের সময় আমি প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের ভক্তদের সঙ্গে ছিলাম, এবং লক্ষ্য করলাম ভক্তরা কত ভক্তির সঙ্গে প্রভুর গুণ্ডিচা মার্জন করছেন। সেই সময় টোটা গোপীনাথ মন্দিরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল বৈষ্ণবাচার্য ১০৮ মোহন্ত মুরারী দাস বাবাজির সঙ্গে।
এরপর, আমার এক সহযাত্রী আমাকে এক আচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করান (উনি থাকতেন ‘মায়ের দান’ বলে একটি আবাসনে), রথযাত্রার দিন। আচার্যদেব আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করায় আমি আমার পরিচয় দিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমি গেছি তোদের আদি বাড়িতে, মা চন্ডিকে দর্শন করে এসেছি।’ সেইদিন আচার্যদেবের আবাসনেই প্রসাদ খেয়ে প্রভুর রথ টানতে যাই।
ঠিক পরের দিন আবার ওনার আবাসনে পৌঁছেই দেখি, উনি একটি হলুদ রঙের বস্ত্র পরে কীর্তন শুনছেন এবং ভাবে বিভোর হয়ে রয়েছেন। কীর্তন শেষে আমি প্রভুজিকে বলি, “আমি কৃষ্ণের নাম করতে পারি?” উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, “তোর মন্ত্রদীক্ষা হয়নি?” উত্তরে জানাই, ‘হ্যাঁ হয়েছে, সংস্কারও হয়েছে।’ উনি সেদিন আর কিছু বলেননি, আমিও একটু চুপ করে থেকে নিজের আবাসনে ফিরে আসি।
ঠিক সেইদিন রাতে ওনার জগন্নাথ দর্শন করতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে শরীর সামান্য খারাপ থাকায় দর্শন দিচ্ছিলেন না। এর পরের দিন সকালে প্রভুজির দর্শনে গেলে ওনার আবাসনে বসেই গাইতে থাকি ‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে….’
গান শেষে দেখি প্রভুজি কাদঁছেন এবং সকলেই রয়েছেন সেই সময়। আমিও আবারও কৃষ্ণের নামের কথা বলায় উনি ওনার এক শিষ্যাকে বললেন আমার কপালে ওনাদের পরম্পরার তিলক এঁকে দিতে। আর নিজে একটি রাধা নামের মালা নিয়ে আমাকে পরিয়ে দিয়ে বললেন, “আজ থেকে তোকে রাধারাণীর দাস করলাম। তোর ইষ্টদেবী ও শ্রীরাধাকে এক জ্ঞান করবি।” আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম যে এত সহজে উনি আমাকে গ্রহণ করবেন! সকলের সামনে উনি আমাকে এমন কথা বলছেন, এটা ভেবেই আনন্দে ভোরে উঠেছিলাম।
তারপরই বললেন, আমার সঙ্গে এই ঘরে আয়। তারপর বেশ কয়েকটি কথা আমাকে বলেছিলেন যা আমি আজও নিজের অন্তরে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করি এবং সেগুলি আমার কাছে এক নতুন পথ দেখায়। প্রভুজি আমাকে বললেন, ” তোর সঙ্গে আমার আজকের আলাপ? বহুদিনের আলাপ, প্রভু চেয়েছেন তাই আজ তোর সঙ্গে দেখা করিয়ে মিলিয়ে দিলেন। তুই মহাপ্রভুর গুরু বংশ তো? (আমার পরিবারের পূর্বপুরুষ হলেন মহাপ্রভু শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীগুরু শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী) যে বংশে মহাপ্রভুর গুরু রয়েছেন, সেই বংশ সঠিক ভাবে ধর্মাচরণ করুক এটাই চাই।” বলেই সঙ্গে সঙ্গে শ্রীশ্রীরাধারাণীর বিশেষ বীজ দিলেন আমাকে, এবং জড়িয়ে ধরলেন। সেই যে অনুভূতি আজও ভুলতে পারিনা আমি। হয়তো জগন্নাথ চেয়েছেন তাই এটা সম্ভব হয়েছে।
এরপর বহুবার আমার প্রভুজির কাছে গেছি, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। শুধু তাই নয় তিনি যখন কলকাতায় আসতেন তখন পৌঁছে যেতাম, তিনি নানান শাস্ত্রের কথা খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন।
একদিন বাড়ি থেকে প্রসাদ খেয়েছি প্রভুজির কাছে গিয়েছি তাঁকে দর্শন করবো বলে। গুরুদেবের বাড়িতে পৌঁছেই দেখি উনি বাকি ভক্তদের সঙ্গে কথা বলছেন। কথা বলতে বলতেই উনি আমার জন্য প্রসাদের বেবস্থা করলেন। শুধু তাই নয়, আমি ধনেপাতার চাটনি প্রভুজির বাড়িতেই খাওয়া শিখেছি এবং সেই স্বাদ আজও ভুলতে পারিনা। উনি দাঁড়িয়ে থেকে প্রসাদ পাইয়েছিলেন, গুরু এমনই হয়। পেট ভরা সত্ত্বেও জোর করে প্রসাদ আবার নেওয়া এবং সেদিন বুঝেছিলাম গুরুবাড়ি গেলে খালি পেট নিয়ে যেতে হবে। কারণ গুরুবাড়ির প্রসাদ অমৃতসম।
আবার, একদিন প্রভুজির বাড়িতে বসে রয়েছি, উনি বললেন যে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তারাপীঠ ভৈরব শ্রীবামদেবের শিষ্য নগেন বাবার সঙ্গে। নগেন বাবার থেকেও বাবা বামদেবের প্রভুর কথা শুনেছেন।
আজকে যে দিনটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে সেটি হল, এমনই এক আবির্ভাব তিথির দিন আমি লেক মার্কেট থেকে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের মালা গেঁথে প্রভুজির জন্য নিয়েছিলাম, এবং সেই মালা পেয়ে তিনি কি যে খুশি ছিলেন সঙ্গে সঙ্গে আশীর্বাদ দিলেন আমায়। আর তারপরই শুরু হল অধিবাস কীর্তন। প্রায় মাঝরাত অবধি চলল সেই কীর্তন এবং কীর্তন শেষে প্রভুজির সঙ্গে আমরা সব গুরুভাই, বোনেরা আনন্দ করে নানান আলোচনা করলাম। গুরুদেবের সঙ্গে কাটানো এক এক মুহুর্ত আমার কাছে আজও স্মরণীয় রয়েছে। পরের পর্বে ওনার সঙ্গে কাটানো আরো কিছু মুহূর্তের কথা বলব, তবে সকলকে অনুরোধ আপনারা নিজ নিজ গুরু এবং আচার্যকে সেবা করুন, তাদের পাদপদ্মে ভক্তি পুষ্প অপর্ণ করুন, তবেই জীবের মুক্তি।