10 Jan শুভ জন্মদিন শ্রীনাথ
~ কলমে চরণাশ্রিত সোমানন্দ (আদরের শুভদীপ)
আজ আমার আশ্রয়স্থল, আমার প্রাণ, আমার জীবনের পরমপিতা আমার মন্ত্রগুরু সাধক দিব্যসুন্দরের শুভ আবির্ভাব দিবস। আজ তাই বাবার কথা লিখতে বসেছি, কি লিখব জানি না, কিভাবে লিখব সেটাও জানি না, এমনকি কি ভাষায় তাঁকে বর্ণনা করব কিছুই জানা নেই আমার। তাঁকে দেওয়ার মতন ক্ষমতা, যোগ্যতা কোনোটাই এই অধমের নেই, তবু চেস্টা করছি মহাসমুদ্রের মতন যার ব্যাপ্তি তাঁকে বর্ণনা করতে।
একটা সময় আমি প্রায় উন্মাদের মতন খুঁজেছি ওনাকে, বাবা বাসুদেবই পাইয়ে দিয়েছেন, তাই পেয়েছি। ভুল পথে যেতে গিয়েও ফিরে এসেছি বাবার শ্রীচরণে, আর তিনিও আমাকে ছেলের মতন টেনে নিয়েছেন। গুরুর স্নেহ কি, গুরুসঙ্গ কি এ আমি নিজের জীবনে ভীষণ ভাবে অনুভব করেছি আমার গুরু, আচার্যদের স্মরণে গিয়ে। তাই আমিও চেষ্টা করি আমার ছেলে মেয়েদের তেমন ভাবেই রাখার।
আমার শ্রীনাথের মন আকাশের চেয়েও বড়, সব শিষ্যদের এক মনে করে উনি কাছে রাখেন, কখনও রাগ করতে দেখিনি, অপরিচিত ব্যক্তিকেও এতটাই স্নেহ দেন যে মনে হয় কতদিনের চেনা তাঁর। সদগুরু এমনই হয়, যাঁকে আঁকড়ে ধরে থাকলেই জীবের উদ্ধার।
সাধক বাসুদেব বাবাকে খোঁজ করতে করতে একদিন আমি তাঁর কাছে পৌঁছে যাই, সেই সময় আমার বড় বাবা (সাধক ভিক্ষুক সুন্দরও রয়েছেন) এবং আমার শ্রীনাথের জ্যেষ্ঠ ভগিনীও রয়েছেন। আমি পৌঁছে গেছিলাম একদিন সন্ধায়, তখন গুরুদেব পূজার আসনে। কিছুক্ষণ পর পেছনে ফিরেই আমাকে দেখে বলেন, ” কিরে এসেছিস? বস!” আমি খুবই অবাক হই যে আমি তো ওনাকে চিনি না, জানি না, উনি আমাকে চেনেন কি করে?
যাইহোক, পূজা সম্পন্ন হলে উনি উঠে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কথা থেকে আসছিস? এত দেরি করে এলি কেন? আরো আগে আসার উচিত ছিল। এক মুহূর্তের মধ্যে আমি ওনার চরণ ধরে বললাম, “আমি ভুল পথে চলে যাচ্ছিলাম বাবা, ভুল মানুষ আমাকে ভুলদিকে পরিচালিত করছিলেন, আপনি আমাকে বাঁচান। বাবা বাসুদেবের নাম করে আজকে বেড়িয়েছি গুরুকে খুঁজতে, আপনার কাছে এসে পৌঁছালাম, আপনি উদ্ধার করুন।” কিছুক্ষণ থেমে বললেন, “বাবাই তো তোকে পাঠিয়েছে, এখন চুপ করে বস, মায়ের কাছে বল, মা তোকে অনেক বড় জায়গায় নিয়ে যাবেন।” আর গুরু বাক্য যে বেদসম তা আজ প্রমাণিত। বড় স্থানে গেছি কিনা জানিনা, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভরসার জায়গা আমি, এটাই গুরু কৃপা।
সেইদিন থেকে প্রায় প্রতিদিন ছুটে যেতাম বাবার কাছে, উনি শুধু বলতেন সময় হোক হবে, এত ভাবছিস কেন? এমনও দিন গেছে বসে রয়েছি বাবা আসেননি মন্দিরে, তবে আমার গুরুভাই, বোনেরা এতটাই সাহায্য করেছেন বা এখনও করেন যে তাদের ঋণও আমি ভুলতে পারবো না। যাইহোক, একদিন বাবা পূজার আসন থেকে উঠে আমাকে বললেন, “শোন, এই দিনে তুই নতুন পোশাক পরে আসন নিয়ে চলে আসবি, তোকে দীক্ষা দেবো।” আমার আনন্দের সীমা নেই, নাচতে নাচতে বাড়ি এসে জানালাম আমার দীক্ষা হবে।
যাইহোক, দীক্ষার দিন উনি আমাকে মন্ত্র দিলেন, নিজের হাতে শিখিয়ে দিলেন কিভাবে জপ করতে হবে, কিভাবে পুজো করতে হবে। আর দীক্ষা শেষে বললেন, “আমি তোর গুরু নই, বাবা বাসুদেবই তোর গুরু।” আজও তিনি সেই কথাই আমাকে স্মরণ করান বারবার, আর বলেন বাবাকে নিয়ে তোকে অনেকদূর এগিয়ে যেতে হবে, পিছনে ফিরে তাকাস না, পিছনে সব ময়লা।
যাইহোক, বাবার সঙ্গে বসে জপ করা, পূজা শেখা, হোম শেখা সবই সম্ভব হয়েছে মা চেয়েছেন বলে। তারপর তন্ত্রে এগিয়েছি দীর্ঘদিন, তবে কোনোদিন তিনি আমাকে আটকে রাখেননি, বা আমি আচার্যের কাছে গেছি বলে তিনি রাগও করেননি, বরং সহযোগিতা করেছেন, তাই তিনি সদগুরু, তাই তিনি ব্রহ্ম, আমি তাঁকেই ইষ্টজ্ঞানে পূজা করি প্রতিদিন।
শ্রীনাথের সঙ্গে কাটানো এত মুহূর্ত রয়েছে, যা একদিনে বলা সম্ভব নয়। তিনি হলেন প্রকৃত দিব্যাচারী মাতৃ সাধক, সাধক বাসুদেবও বলে গেছিলেন যে শেষে দিব্যভাব রাখতে পারলেই তিনি মাকে পাবেন। তিনি হলেন প্রেমের আঁধার, কিভাবে সকলকে আপন করতে হয়, কিভাবে সকলের মধ্যে মায়ের নাম ছড়িয়ে দিতে হয় সেই শিক্ষা আমি আমার শ্রীনাথের থেকেই পেয়েছি। তিনি আমাকে আজও এতটাই মনে রাখেন যে আমি সুযোগ না পেলেও, তিনি আমার শিষ্যদের ফোন করে আমার খোঁজ নেন, আমার শরীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন, আর সকলকে বলেন, “এ আমার ছেলে, দেখ এ আমার এক পাগল ছেলে।”
এতকিছু তন্ত্রে শিখে আজ মনে হয় কিছুই প্রয়োজন নেই আমার, গুরু রয়েছেন তো সঙ্গে আর কি চাই? শত আঘাতও সহ্য করে নিয়েছি কারণ আমার গুরু সবসময় সঙ্গে রয়েছেন আর আচার্যরা সূক্ষে আমাকে সাহায্য করে চলেছেন, আর কিছুরই প্রয়োজন তেমন নেই।
মায়ের হোম শিখবো বলে একদিন শ্রীনাথকে বলি, তিনি সঙ্গে সঙ্গে একটি খাতা এনে আমাকে এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কিভাবে মায়ের হোম করতে হবে। কিভাবে কাঠ সাজাতে হবে, কিভাবে কি কি উপাদান দিতে হবে। হ্যাঁ, তবে আমাকেই এগিয়ে যেতে হয়েছে গুরুর কাছে, কারণ শিখতে গেলে শিক্ষকের কাছে এগিয়ে যেতে হয় ছাত্রকে এটাই নিয়ম।
সাধক বাসুদেবের কাছের জন ছিলেন আমার শ্রীনাথ এবং তাঁর বড়দাদা (আমার বড় বাবা, সাধক ভিক্ষুক সুন্দর)। দীর্ঘ বহু বছর সাধক বাসুদেব আমার গুরুবাড়িতে ছিলেন, মা বগলামুখীর চিত্রপট এঁকেছিলেন আমার গুরু বাড়িতে বসেই, সেই চিত্রপট আজও পূজিত হয় মন্দিরে। আমার গুরুদেবের নামও বাসুদেব বাবার নির্বাচন করা, তিনিই একমাত্র সাধক ভিক্ষুক সুন্দর এবং পরবর্তীকালে সাধক দিব্যসুন্দরের হাতে এই পরম্পরা দিয়ে গিয়েছেন (যার প্রমাণাদি রয়েছে, স্বয়ং বাসুদেব বাবার লেখা চিঠি, ১৯৮২ সাল)।
গুরুর আবির্ভাব তিথিতে গুরুকে বন্দনা করাই শিষ্যের একমাত্র কর্তব্য। কিন্তু আমি তাঁর কি বন্দনা করবো? আমি তো অধম সন্তান তাঁর, আমি তো তাঁর নিজের, তাই আজকের দিনে আমি শুধু তাঁর সঙ্গে আমার কথপোকথন এর সামান্য অংশ তুলে ধরছি আপনাদের সামনে।
১৯৭৫ সালে কাশীমিত্র শ্মশান ঘাটে বাবা বাসুদেব দীক্ষা দেন আমার বড় বাবা সাধক ভিক্ষুক সুন্দর প্রভুকে এবং বাবা বাসুদেব কলকাতা, নিবিড়া সহ চিত্তরঞ্জন, শিলিগুড়ির দায়িত্ব দিয়েছিলেন (যার প্রমাণাদি রয়েছে বাবার নিজের হাতে নির্মিত মন্দিরের কপিতে ভিক্ষুক সুন্দর প্রভুর নাম করে গিয়েছেন)। ১৯৭৮ সালে কালীপূজার দিন সাধক শ্রীমৎ বাসুদেব পরমহংস দীক্ষা দেন আমার শ্রীনাথকে (তখন কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন চাকুরি করতেন আমার শ্রীনাথ। তিনি বলেন সেই চাকুরীও বাবার কৃপায় হয়েছে), সেই থেকে তিনি মাকে ধরে রয়েছেন। আজও একইভাবে মায়ের সেবা করে যাচ্ছেন।
শুধু তাই নয়, আমার মেজ বাবাও (শ্রীনাথের মেজ ভাই) বাসুদেব বাবার দীক্ষিত শিষ্য। সাধক বাসুদেব তাঁকে নিয়ে তীর্থে ভ্রমণ অবধি করতে গেছিলেন, শিখিয়েছেন নানান কিছু। যাইহোক, আজ আমার আনন্দের দিন, কারণ আমার শ্রীনাথের আজ আবির্ভাব দিবস। তিনি আজও বলেন, তুই এগিয়ে চল, শত বাঁধা এলেও তোকে টলানো সম্ভব নয়, কারণ তোর গুরু স্বয়ং বাসুদেব বাবা। বাবা বাসুদেব তোকে দিয়েই ওনার অপূর্ন কিছু কাজ করাবেন বলেই বেবস্থা করছেন সব, এ আমার পরম প্রাপ্তি, আর কি চাই এই মনুষ্য জীবনে? গুরু যাকে মনে রাখে তার এমনই ওপার হয়ে গিয়েছে, তার কোনো ভাবনাই নেই।
সাধারণত, আমার গুরু বাড়ির শ্রীবিগ্রহ সবসময় সকলকে ছুঁতে দেওয়া হয়না, কারণ তিনি মহাবিদ্যা, কোনো ছেলেখেলার বস্তু নন। (একমাত্র মায়ের অভিষেকের দিনই সকলে মাকে পবিত্র জল দিয়ে অভিষেক করাবার সুযোগ পান মাত্র) একদিন আমি বাবার কাছে গেছি মায়ের জন্য একটি মালা নিয়ে, বাবাকে মালাটি পরিয়ে দেওয়ার কথা বলতেই উনি শুদ্ধ পোশাক পরতে যান। কিছুক্ষণ পর এসে আমাকে বলেন, “শোন, মা বলছেন তুই আজকে মাকে মালাটি পরিয়ে দে, আমাকে বলল ওকেই বল মালাটি দিতে।” আমি বললাম যে আমার কাছে তো এই মুহূর্তে শুদ্ধ বস্ত্র নেই, কি করবো? সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন, “কেন? আমার শুদ্ধ কাপড়টাই পরে নে, অসুবিধা কি?” আমিও সেই বস্ত্র পরে মাকে সাজালাম।
মাঝে মাঝে গুরুর কাছে গেলে, গুরুর শ্রীমালা ছাড়াও মায়ের জন্য মালা নিয়ে যাই, আর তিনিও সুযোগ দেন মাকে সেই টুকু সেবার। এমনকি প্রতিদিন তিনি নজর রাখেন আমি কোথায় হোম করছি, কিভাবে আমার মাতৃ মিশনে মাকে সাজিয়েছি সবকিছু। অর্থাৎ, গুরুর শ্রী চোখে যে শিষ্য থাকে, তার উদ্ধারের আলাদা পথ খুঁজতেই হয়না।
প্রসঙ্গত, আমি আমার মনের সকল কথাই শ্রীনাথকে জানাই, কারণ আমার এতটাই দুর্ভাগ্য যে বাকি আচার্যগণ তাঁদের স্থূলদেহ ত্যাগ করেছেন বহুদিন হল। আর তাই আমার মন্ত্রগুরু মন দিন আমার কথা গুলি শোনেন, আর বলেন যে বাবার কৃপা তোর ওপর ভীষণ ভাবে রয়েছে। গুরু কৃপাতেই আমি সাধক বাসুদেবের বহু তথ্য (১৯৭৭-১৯৮৫ এবং ১৯৮৬-১৯৯২) আমার কাছে তাঁরই শিষ্য, পরিবারের সদস্যরা এমনকি বিদেশী শিষ্যরাও তুলে দিয়েছেন। আর আমিও গুরু কৃপায় সেগুলি যত্ন করে রেখেছি, কারণ এগুলি অমুল্য রত্ন সম্পদ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন (বর্তমানে সেই সমস্ত নথি, তথ্য, চিঠি, ছবি, অপ্রকাশিত বাণী বগলামুখী মাতৃ মিশনে সযত্নে রয়েছে)।
যাইহোক তুমি ভালো থাকো বাবা, তুমি সুস্থ থাকো, আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে যাবো দেখা করতে, তখন আবারও বাসুদেব বাবাকে নিয়ে আলোচনা হবে তোমার সঙ্গে। তুমি সবসময় আমার মাথার ওপর হাত রেখো যেন আমি তোমার কথাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারি। জয় গুরু। জয় মা।
