06 Oct মা আছেন আর আমি আছি, ভাবনা কি আর আছে আমার’- এক আত্ম উপলব্ধি
সাধক তাঁর নিজ সাধ্যমত ইষ্টকে ভোগ রন্ধন করে দেন। সেই ভোগ তখনই সুস্বাদু হয় যখন তা জগজ্জননী নিজে গ্রহণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। তবে যদি আদিশক্তি নিজেই সেই ভোগ গ্রহণ করে ভক্তদের জানান দেন তাঁর উপস্থিতি তখন সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না কোন ভক্তই।
দেব বিগ্রহে তীব্র জ্যোতি এবং উজ্জ্বলতা প্রকাশ পায় সাধকের সেবায় এবং ভক্তিতে। মাতৃ বিগ্রহের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনি সদা জাগ্রত রয়েছেন বা তিনিও কখনও কখনও বুঝিয়ে দেন তাঁর উপস্থিতি ভক্তমণ্ডলীর কাছে।
তন্ত্রপীঠ বাংলায় এমন জাগ্রত দেবভূমির সংখ্যা হাতে গুণে শেষ করা সম্ভব নয়। সতীপীঠের পাশাপাশি শক্তিপীঠ, শিবপীঠ, বৈষ্ণবপীঠ ইত্যাদি নানান দেবালয় বর্তমান। কারণ বঙ্গ শাক্ত-শৈব-বৈষ্ণবের মিলনক্ষেত্র। তবে সাধক নিজ ইষ্টের মধ্যেই জগতের সমস্ত দেব বিগ্রহকে উপলব্ধি করেন এবং সর্বোপরি ব্রহ্মের সাধনায় নিজেকে নিযুক্ত করেন।
আজ আমার দুই শিষ্যা এসেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চল থেকে। দীর্ঘদিন তাঁরা মায়ের বাড়ির ভক্ত এবং আশ্রিত। মা যেহেতু পীতপুষ্পপ্রিয়া সেহেতু মায়ের প্রিয় রঙ পীত, তাই তারা মায়ের পছন্দের হলুদ মিষ্টি ও মালা নিয়ে আসেন মায়ের বাড়িতে।
আজ ঢাকুরিয়া বগলামুখী মাতৃমিশনে শিষ্যা গ্রহভঙ্গ কালসর্প দোষ প্রশমনে বিশেষ পূজা ও হোম সম্পন্ন করলাম তাদের উপস্থিতিতেই। তারা মায়ের প্রসাদ পাওয়ার আগে বললেন, ‘গুরুদেব, মাকে মালাটি পরিয়ে দিও এবং মিষ্টিটি নিবেদন করে দিও।’ আমি উত্তরে জানালাম, হ্যাঁ নিশ্চয়। সেই মুহূর্তেই আমি মাকে মালাটি নিবেদন করলাম তবে ভেবেছিলাম মিষ্টিটা আগামীকাল সকালের নিত্য পূজায় নিবেদন করবো।
গ্রহদোষ প্রশমনের বিশেষ যজ্ঞের পর শিষ্যাদের প্রসাদ দেবো বলে নীচে নেমে আসি, তবে মিষ্টির বাক্সটি মায়ের কাছেই রাখা ছিল। ভক্তরা প্রসাদ পেয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন এবং সন্ধ্যা নামতেই আমরাও তৈরি হতে শুরু করলাম সন্ধ্যারতির। সন্ধ্যারতি শেষে আমার অর্ধাঙ্গিনী বলেন, ‘মায়ের প্রসাদী মিষ্টিটা ওপরেই রেখে চলে এসেছো?’ আমি সেই মুহূর্তে অবাক হয়ে আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি এবং বলি, ‘ওটি প্রসাদী নয়, আগামীকাল ভোগে দেবো।’ তখন অর্ধাঙ্গিনী বাক্সটি দেখায় যে বাক্সটির সিল করা পেকেট ঠিক যেমন ভাবে কাটা হয় ঠিক তেমন ভাবে কাটা রয়েছে।
অদ্ভুত চিত্তে আমরা ভাবতে থাকি যে, কিভাবে সম্ভব এটি? মায়ের কাছে কেউ ওঠেনি এবং ওই মিষ্টির পেকেটের মুখ এত নিখুঁত ভাবে কাটা কোন পোকামাকড়ের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে সেটি খুলল কে? ইতোমধ্যেই আমার অর্ধাঙ্গিনী বলে যে, এখানে সাতটি কমলাভোগ রয়েছে, তুমি ওনাদের প্রশ্ন করো যে কটি কমলাভোগ এনেছিলেন ওনারা।
এক মুহূর্ত দেরি না করে ফোন করি শিষ্যাকে। উত্তরে জানতে পারি, ‘আমারই শিষ্য গতকাল রাত্রে আটটি কমলাভোগের পেকেট এনেছিলেন!’ উত্তর পাওয়ার পর আবারও মনে হল মা হয়তো প্রসাদ নিজেই পেয়েছেন। আমাদের মায়ের বাড়ির সদস্যরা এখনও অবধি বুঝে উঠতে পারিনি একটি কমলাভোগ কে গ্রহণ করলেন এবং সেটি এত অগোচরে কিভাবে সম্ভব! ইতোমধ্যেই শিষ্যাও আনন্দিত যে, তার আনা প্রসাদ স্বার্থক রূপ পেল এবং আমিও খুশি কারণ, ভক্ত অন্তরেই তিনি বিরাজমান যে, আর তিনি অন্তরে খুশি মানেই পক্ষান্তরে আমার জগজ্জননী খুশি।
বলাবাহুল্য, এর আগেও বহুবার ঢাকুরিয়া বগলামুখী মাতৃমিশনে এমন অলৌকিক দৈব নির্দেশ বিভিন্ন শিষ্য, ভক্তদের সঙ্গে ঘটেছে এবং আজও তার ব্যতিক্রম নয়। এবার এটি মায়ের কি ইঙ্গিত তা বোঝার ক্ষমতা বা সাহস কোনটাই নেই। আমি সাধারণ সেবক, মায়ের চরণাশ্রিত হয়েই বাঁচতে চাই। এই ঘটনার কোন বৈজ্ঞানিক কিংবা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এত উচ্চস্তরে পৌঁছাতে পারিনি আমি। তবুও তিনি যে এই বাড়ির সর্বত্র বিরাজ করেন সেই কথা ভক্তদের মুখেই শুনতে পাই।
এবার বলি, বেশ কিছু ঘটনা দেখে কেউ আবার একমাত্র জীবন্ত বলে এর অপব্যাখ্যা করবেন না। কারণ দেবতা সর্বত্র জীবন্ত, তিনি সর্বত্র বিরাজমান। নানান স্থানে তিনি নানান লীলায় রয়েছেন। কোথাও কৃষ্ণ স্বরূপে, কোথাও আবার কালী-দুর্গা-শিব স্বরূপে। হ্যাঁ, অন্য দেবভূমির মতন এই স্থানেও তিনি জাগ্রত এটি অবশ্যই বলতে পারেন।
আর দৈবক নির্দেশ এমন নানান ভাবে আপনাদের মধ্যেও বর্তিত হতে পারে, কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক পথ, দরকার একনিষ্ঠতা এবং প্রাণের রন্ধ্রে সেবা। আপনারাও নিজ নিজ গুরুর স্মরণাপন্য হয়ে এই পথে এগিয়ে যান, আমার শুভ কামনা রইল।
-চরণাশ্রিত সোমানন্দ