সোমানন্দের আত্ম উপলব্ধি - Somanandanath
16075
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16075,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

সোমানন্দের আত্ম উপলব্ধি

সোমানন্দের আত্ম উপলব্ধি

সাধক “বাসুদেব”, এই নামটি আমার জীবনে প্রতিটি মণিকোঠায় বিরাজমান। আমি সাধক বাসুদেবের পরম্পরায় কেবলমাত্র মন্ত্র দীক্ষিত হলেও আমি ওনাকেই পরমগুরু বলে মনে করি। কারণ, নিজে ষড়ান্যায় প্রাপ্তির পর উপলব্ধি করেছি সংসারীদের জন্য সহজ পথ একমাত্র বাবার নামেই হতে পারে। আমি যখন বাঁকুড়ার মহাশ্মশানে আমার তন্ত্রের আচার্যদেব কূলাবধূতাচার্য শ্রীমৎ বিশ্বেশ্বরানন্দ নাথের কাছটে সংস্কারপ্রাপ্ত হই, তখন আচার্যদেবকেও বলেছিলাম বগলামুখী মা-ই আমার ইষ্টদেবী, আমি সাধক বাসুদেবকেই ধ্যান জ্ঞান মনে করেছি, আপনি আমাকে সেই ভাবেই সংস্কার করবেন। আর তিনিও সম্মতি জানিয়ে আমাকে সংস্কার দেন।

ছোটো থেকেই বাড়িতে বগলামুখীর ছবি পুজো করতে দেখেছি আমার জন্মদাত্রীকে। তখন বুঝতাম না ইনি কে, কিন্তু অদ্ভুত অনুভূতি হত মাকে দেখলেই। আর যখন সাধক বাসুদেবের ছবি দেখি, তখন থেকেই তাঁকে জানার আগ্রহ, চেনার আগ্রহ ছিল। হয়তো সেই কারণেই তিনিও আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তাই আজ তাঁর শিষ্য শিষ্যারা আমাকে আশীর্বাদ করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন বাবাকে নিয়ে ভাবার জন্য। কারণ, আমি মনে করি আমার পরমারাধ্য নাথ যোগী সাধক বাসুদেব পরমহংসের নাম প্রচার হওয়া খুব প্রয়োজন বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে গৃহীদের কাছে। দেখুন সাধক নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন যে তিনি কোন আদর্শকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন।

সংসারীদের জন্য আমার উপোদেশ, জগতসংসারে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করুন জগজ্জননীর সেবায়, কারণ কলিযুগে তাঁকে পাওয়া যায় সবচেয়ে সহজ উপায়ে। ভক্তি-সেবা আর সরল বিশ্বাসের ওপর ভর করে তাঁকে সেবা করে চলুন স্মরণে এবং মননে। বাহ্যিক আড়ম্বর এবং সমস্ত চিন্তা অর্পণ করুন মায়ের রাতুল চরণে, আর ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করবার কৃপা চেয়ে নিন তাঁর থেকে।
সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বাধা-মুক্তি এই সমস্তটা নিয়েই সংসার। এই যাত্রাপালায় রঙ মেখে সঙ না সাজলে তার সংসারে থেকে কোন লাভ নেই। তাই আপনারা মায়ের আশীর্বাদী রঙ মাখুন সারা অঙ্গে আর তাঁর ভৃত্য হয়ে সঙ সাজুন তবেই মুক্তিলাভ সম্ভব।
কর্ম ছাড়া ধর্ম হয়না এই কথাটি যেমন সর্বতভাবে সঠিক ঠিক তেমনই সৎ কর্ম ছাড়া মুক্তিলাভ অসম্ভব এটিও সঠিক। এবার কর্ম করতে গেলে বিভিন্ন মানুষের সম্মুখীন হতে হবে এবং তাতে সামান্য আঘাত পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু সেই আঘাতের কোন চিহ্নই আপনার শরীরে স্থায়ী হবে না যদি আপনি একচিত্তে জগজ্জননীকে ধরে রাখেন। মানব জন্ম পেয়ে এমন কিছু কর্ম করে যান যাতে স্থূলদেহ ছেড়ে গেলেও মানবের মনে আপনার স্থান চিরস্থায়ী হয়।

জীবের শ্রেষ্ঠ জন্ম হল মানব জন্ম, আর সেই জন্মে কর্মের পাশাপাশি ভগবান সেবা, ভক্তিমার্গে থেকে ঈশ্বরকথা শ্রবণ করা এবং নিজ অন্তরের অন্ধকারকে দূর করা এগুলি না করলে আপনার এ জন্ম বৃথা। কারণ মানব ছাড়া অন্য সমস্ত জন্মেই ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে, নেই শুধু কর্মফল এবং আত্ম উপলব্ধি। তাই সঠিক কর্ম করার পাশাপাশি নিজেকে চেনার চেষ্টা করুন। আর নিজেকে চিনতে পারলে তবেই ভগবানকে চিনতে পারবেন, কারণ আপনার অন্তরেই তাঁর বাস। তাই অযথা ভারাক্রান্ত না হয়ে জেগে উঠে মায়ের চরণে মনোনিবেশ করে কর্মে করে যান, জন্ম শেষে ভগবতী নিশ্চয়ই আপনাকে কৃপা করবেন।

আমি যখন বাসুদেব বাবাকে চিনতে শুরু করি তখন থেকেই বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যেতাম বাবাকে খুঁজতে। বলাবাহুল্য, আমি খুঁজে খুঁজেই বাবাকে পেয়েছি, বাবার নানান দিকের সন্ধান পেয়েছি। আমি ঢাকুরিয়ায় থাকি, সে কারণে বাবার বিহার থেকে চলে আসার পর ঢাকুরিয়া মুখার্জি পাড়ায় থাকতেন এবং শেষ লীলায় তিনি কাঁকুলিয়ায় থাকতেন। আর এই দুই স্থান আমার বাড়ি থেকে খুবই কাছে। বহুবার ঘুরে ঘুরে খুঁজেছি বাবার সেই জায়গা, অঞ্চলের বাসিন্দাদের বাড়ি গিয়ে গিয়ে খোঁজ করেছি বাবাকে। অবশেষে, মায়ের আশীর্বাদে আর বাবার কৃপায় আমি সেই স্থান খুঁজে পাই। ঠিক, উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর যেদিন গুলি কলেজে যেতে হত না, সেই সব দিন প্রায় উন্মাদের মতন কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতাম বাবার খোঁজে। আজও খুঁজে চলেছি সাধক বাসুদেবকে।
সবথেকে বড় কথা, সাধক বাসুদেবকে আমি স্থূলদেহে দেখিনি ঠিকই, কিন্তু সূক্ষ্মদেহে তাঁকে দেখেছি, অনুভব করেছি বহুবার। আর অনুভব করেছি বলেই হয়তো তিনিই আমাকে দিয়ে বহু কাজ করিয়ে নিয়েছেন, আমি অযোগ্য জেনেও সেই কাজগুলি করিয়েছেন যাতে আমি তাঁকে অনুভব করতে পারি। আজও আমি আমার জীবনে সাধক বাসুদেব পরমহংসের আদর্শকে পাথেয় করে চলি। তন্ত্রে বিভিন্ন অভিষেকের পর একসময় গিয়ে মনে হয়েছে জীবনে মা’কে ডাকার মতন আনন্দ কিছুতে নেই। তাই মায়ের নাম প্রচার করবো এবং সাধক বাসুদেবের নাম প্রচার করবো।

প্রতিদিন সকালবেলা নিত্য পূজা সম্পন্ন করে বেরিয়ে পড়তাম গুরুকে খুঁজতে। বাবা কোথায় কোথায় যেতেন, তাদের যদি একবার খুঁজে পাওয়া যায়। সবসময় এই কথাই চিন্তা করতাম। এখন দেখি তিনিই সকলকে কেমনভাবে আমার কাছে নিয়ে আসছেন আর তারাও আমাকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন বাবাকে নিয়ে আরও কাজ করবার জন্য। জগৎ সংসারে কোনকিছুই নিত্য নয় সবই একদিন না একদিন ধ্বংস হবে। কিন্তু গুরুর শ্রীচরণ নিত্য শুদ্ধ সচ্চিদানন্দ স্বরূপ, তাঁর কৃপায় থাকলে সবই পাওয়া সম্ভব। তাই গুরুর নাম প্রচার করাকে আমি একজন সঠিক শিষ্যের প্রথম দায়িত্ব বলে মনে করি।

বাবা বাসুদেবের আদর্শ সবসময় আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি এত এত গান লিখেছেন, আমিও একটু গান গাইতে পারি গুরুদের কৃপায়। আমিও একদিন গুরুপূজা শেষে একটা ডাইরি ও পেন নিয়ে বসলাম যে আমি গান লিখতে পারি কিনা। প্রথম দুটি লাইন লেখার পর আর শব্দ না আসায় বাবাকে বললাম যে হবে না আমার। বলতেই পরের লাইন এলো- … পাষাণ প্রতিমা নয় যে মা জ্যোতির্ময়ী সাজে। রত্ন সিংহাসনে আজ বগলা বিরাজে…..” সেই যে গান লেখা শুরু করলাম, সারাদিনে এক ডায়ারি গান লিখেছি। কিভাবে লিখেছি বা কখন লিখেছি তা সত্যি বুঝতে পারিনা। তবে বিশ্বাস যে, বাবাই হয়তো লিখিয়ে নিয়েছেন।

আরও একবার হোমের সময় সমস্ত ভক্তরা দেখছেন যে, প্রচণ্ড বৃষ্টিতে হোমের কাঠ, বালি এমনকি কপ্পূর ভিজে গিয়েছে। সকল ভক্ত চিন্তিত যে এই কুণ্ডে হোম কিভাবে সম্ভব। কি মনে হল, সবসময় তো বাবাই বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছেন এবারও তিনি রক্ষা করবেন। এই বলে বাবার কাছে জানানোর পরই এমন উচ্চতায় হোমের আগুন উঠল যে সকল ভক্ত জিজ্ঞাসা করল যে এটা কিভাবে সম্ভব হল! আমি উত্তর দিলাম, সব বাবার করুণা। বাবা বাসুদেব সবসময়ই এমন ভাবে রক্ষা করে এসেছেন আর আগামীদিনেও রক্ষা করবেন।
…. উল্লিখিত আত্ম উপলব্ধি পড়ে দেখবেন এবং আপনারাও নিজ নিজ গুরুর নাম প্রচার করবেন। যদি ভালো লাগে জানাবেন, গুরু কৃপায় পরের গ্রন্থে আরও উপলব্ধির কথা বলব।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com