যেই রাধা-সেই বগলা' অভেদ তত্ত্ব সন্ধানে কূলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ - Somanandanath
16079
wp-singular,post-template-default,single,single-post,postid-16079,single-format-standard,wp-theme-bridge,wp-child-theme-bridge-child,bridge-core-3.0.2,qode-page-transition-enabled,ajax_fade,page_not_loaded,,qode-child-theme-ver-1.0.0,qode-theme-ver-28.8,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-6.9.0,vc_responsive
 

যেই রাধা-সেই বগলা’ অভেদ তত্ত্ব সন্ধানে কূলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ

যেই রাধা-সেই বগলা’ অভেদ তত্ত্ব সন্ধানে কূলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ

শক্তির উপাসক হলেও বিষ্ণু এবং শিবলোকে ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে আমার পরমারাধ্য গুরু বাসুদেবের কৃপায়। তিনি চেয়েছেন বলেই মাকে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছি এবং বিভিন্ন লোকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। উপনয়নের পরই এক আচার্যের আশীর্বাদে আমি এক দিব্যজ্যোতি প্রাপ্ত শিবমন্ত্র পাই এবং তার বহুপরে বৈষ্ণব পথেও কৃপা মিলেছে এক আচার্যের জন্য।

আমার শ্রীনাথ সাধক বাসুদেবের প্রথম মন্ত্রসিদ্ধি হয় পুরীর স্বর্গদ্বার শ্মশানে। ঠিক সেই ভাবেই পুরীধামে আমার সেই আচার্যের কৃপা হয় এবং আমি রাধামন্ত্রে দীক্ষিত হই। সনাতনধর্মে সকল পথের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস না থাকলে সে কখনই ব্রহ্মের কৃপা লাভ করতে পারে না। একবার পুরীর জগন্নাথের রথযাত্রায় আমিও অন্য ভক্তদের মতন সামিল হই শ্রীক্ষেত্রে। পরিবারের সদস্যদের একপ্রকার অবাক করেই সেবারে যাত্রা শুরু করেছিলাম। কারণ, যে দিন ট্রেনে উঠবো ঠিক তার আগের দিন কনফার্ম টিকিট পাই। তবে যাত্রার সময় বহু ভক্তের মুখে শুনি যে তারা প্রায় ছয়মাস আগে থেকে টিকিট পেয়েছে তবে হয়তো গুরু কৃপা ছিল তাই আগের দিনই টিকিট পাই।

যাইহোক, পুরী পৌঁছেই গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের ‘উড়িয়া-গৌড়িয়া মিলন’ উৎসবে সামিল হই দীননাথের মন্দির প্রাঙ্গনে। সকলে যখন জগন্নাথ-গৌর প্রেমে মত্ত তখন আমি যতবার মন্দিরের চূড়ার দিকে তাকাই ততবারই যেন মনে হচ্ছে আমার বগলা আর জগন্নাথ মিলিত হচ্ছে বাসুদেবের হৃদে। এটাই হয়তো আমার শ্রীনাথের ইচ্ছা যে গুরুই ব্রহ্মা-গুরুই বিষ্ণু এবং গুরুই ইষ্টস্বরূপ।

এর পরদিন ‘গুণ্ডিচা মার্জন’ উৎসবে গুণ্ডিচায় যাই প্রভুর আগমনের রাস্তা পরিষ্কার করতে অন্য ভক্তদের পাশাপাশি। তখনও আমি এবং আমার এক শিষ্য স্পষ্ট দেখতে পাই এক বালিকা হলুদ বস্ত্র পরে হাতে একটা মাটির কলসি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে এবং সেই কলসিটি দিয়ে আমাকে চলে যায়, কিন্তু পরক্ষণে সেই বালিকাকে আর কোথাও খুঁজে পাই নি। তারপর লীলা চলাকালীন বহু সাধুসন্তের সঙ্গ পাই যা কখনও ভোলার কথা নয়।
রথযাত্রার দিন সকাল এক বাবাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তিনি হলেন শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মাতুলালয়ের বংশধর শ্রী কল্যাণ গোস্বামী মহারাজ। তিনি আমার বংশ পরিচয় জেনে আমাকে বলেন, ‘বিরাট বংশ তো তোদের, একসময় পাঁঠার মাথা নিয়ে নাচানাচি করতো, বহুবার গেছি তোদের বাড়িতে’। তবে আমার ওনাকে দেখেই আমার কৃষ্ণপ্রেম আরও প্রকট হয় এবং আমি নাম পাওয়ার আশায় বসে থাকি। তবে এখন বুঝতে পারি যে কেন ভালোলাগা, কারণ তিনি হলুদ বস্ত্র এবং কপালে রক্ত তিলক পরেছিলেন এবং ছোটো থেকেই হলুদের প্রতি আমার ভীষণ টান। আর সর্বোপরি গুরু চেয়েছিলেন তাই ওনার সান্নিধ্য পেয়েছি।

আমি যখন প্রথমে ওনাকে বলি এই নাম পাওয়ার কথা উনি তখন কিছুই উত্তর করেননি শুধু জানতে চেয়েছিলেন, ‘তোর মন্ত্রদীক্ষা হয়নি?’ উত্তরে বলেছিলাম ‘ হ্যাঁ, আমি তন্ত্রে ষড়ান্যায় প্রাপ্ত, তবে কালী-কৃষ্ণ তো অভেদ, নাম তো আমি ওনার করতেই পারি।’ উনি শুধু শুনলেন, তবে কিছুই উত্তর করলেন না। এরপর আমার মন্ত্রগুরুকে এই কথা বলায় উনি বলেন, ‘তুমি গেছো আর সেখানে কোন অলৌকিক কিছু ঘটবে না, এটা সম্ভব? এখনই আমাকে জানানোর কিছু হয়নি, যাত্রা শেষে ফোন করবে কি কি পেলে।’ হয়তো উনিও জানতেন যে জগন্নাথ রাধা রূপে কৃপা করবেন আমাকে।

পরের দিন আবারও মহারাজের সঙ্গে দেখা করতে গেলে ওনার শিষ্যরা বলেন, ওনার জ্বর হয়েছে তাই দর্শন দেবেন না। মন খারাপ করে অক্ষয়ধামে ফিরে আসি, কিন্তু মন কিছুতেই মানছে না। তাই দুপুরবেলা আবারও লুকিয়ে লুকিয়ে ওনার ঘর অবধি পৌঁছে যাই। আর দরজা খুলেই আমাকে দেখে মহারাজ আনন্দের সঙ্গে বলেন, ‘আয়, ভেতরে আয়। তুই ভালো গান গাস, তাই আমাকেও শোনা একটা ভজন।’ ‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’ গাওয়া শেষে দেখতে পাই পিছনে মহারাজের সকল শিষ্য আমার দিকে তাকিয়ে আছেন ও মহারাজের চোখে জল।’

সেই সময় মহারাজ সকলের সামনে আমাকে বললেন, ‘আজ থেকে আমি তোকে রাধারানির দাস করলাম, রাধা-বগলাকে একরূপে দেখবি।’ বলেই ওনার এক শিষ্যাকে তিলক করে দিতে বলেন এবং তিলক শেষে দরজা বন্ধ করে দেন। সেই সময় মহারাজ আমাকে দেখে বলেন ‘ তোর সঙ্গে কি আজকের আলাপ? আলাপ বহুদিনের, ইজগন্নাথ চেয়েছেন তাই মিলিয়ে দিলেন। তুই তো মহাপ্রভুর গুরুবংশ, তাই মহাপ্রভুকে তাঁর গুরু যে মন্ত্র দিয়েছিলেন আমি সেই মন্ত্র তোকে ফিরত দিলাম।’ এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের গুরু শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী হলেন আমার বংশের পুর্বপুরুষ। আর যখন আমাকে মন্ত্র দান করছিলেন, আমার মনে হল যেন পূর্ণ হলাম, যেন এক হল আমার অভেদ তত্ত্ব।

তারপর থেকে একের পর এক লীলার সাক্ষি থেকেছি আমি, শুনেছি নানান তত্ত্বকথা, শাস্ত্রের বাণী। তবে বছর ঘুরতে চলল মহারাজের স্থূলদেহ নেই আমাদের মধ্যে, কিন্তু যতদিন ছিলেন ততদিন কলকাতায় এসেছেন আগের দিন ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, আদর করে খাইয়েছেন, শুনিয়েছেন নানান বাণী।’ সেবারের জগন্নাথ দর্শন আমার সত্যি সার্থক হয়েছিল, আজও মনে পরে সেদিনগুলি।

Somananda Nath
roychoudhurysubhadip@gmail.com