06 Oct কৌশী অমাবস্যার সঠিক তথ্য
সনাতন হিন্দুধর্মে মূল যে পাঁচটি ধারা (শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, সৌর ও গাণপত্য) রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান শক্তি পরম্পরা। অর্থাৎ দেবগণ মা ছাড়া অচল। বলাবাহুল্য জগত সংসার যখনই কোন না কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে তখনই দেবীদের আবির্ভাব ঘটেছে। কখনও তিনি নিজে আবার কখনও তাঁর নির্দেশিত শক্তি অসুরের সংহার করে শুভ শক্তির জয় পতাকা উত্থিত করেছে। তাছাড়া কলিযুগে যা কর্মই মানুষ করে তাই তন্ত্রক্ত, কিংবা তন্ত্রের সঙ্গে পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিষ্ণুক্রান্তার অন্তর্গত বঙ্গদেশ- কালীক্ষেত্র, অর্থাৎ শক্তি সাধনার পীঠস্থান এটি। এখানে দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী সহ একাধিক মহাবিদ্যার আরাধনা সাড়ম্বরে পালিত হয় বছরের পর বছর ধরে। তবে বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষজনের কাছে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পৌঁছানো হয় যাকে আমরা ‘মিথ’ বলে উল্লেখ করতে পারি।
তেমনই একটি মিথ হল ভাদ্র মাসের অমাবস্যাকে কৌশিকী অমাবস্যা বলে বিভ্রান্ত ছড়ানো। কারণ ভাদ্র মাসের সঙ্গে দেবী কৌশিকীর কোন সম্পর্ক নেই। বলাবাহুল্য এই অমাবস্যাকে কৌশী অমাবস্যা বলেই উল্লেখ করা সমীচীন। কারণ, এই কৌশী শব্দটির উৎপত্তি ‘কুশ’ থেকে। অর্থাৎ এই তিথিতে পূজার অন্যতম সামগ্রী ‘কুশ’ চয়ন করা যায়। কথিত আছে, ভগবান শ্রীবিষ্ণু শয়ন একাদশীতে যোগনিদ্রায় মগ্ন হন এবং উত্থান একাদশীতে তাঁর নিদ্রা ভঙ্গ হয়। আর পুরাণে, কুশ বলতে জগতপালক শ্রীবিষ্ণুর ‘রোম’কে বোঝানো হয়। আর তাই তাঁর যোগনিদ্রায় কুশ চয়ন করলে ভগবান ক্রুদ্ধ হতে পারেন। তাই শাস্ত্র বলছে, ভাদ্র মাসের এই অমাবস্যা তিথিতে কুশ চয়ন করা সম্ভব। আর এই তিথিতে কুশ চয়ন করলে একবছর সেই কুশ শুদ্ধ থাকে বলেই উল্লেখ রয়েছে। আর তাই সেই থেকে কৌশী নামটির সৃষ্টি।
এর পাশাপাশি, এই তিথিতে তারাপীঠ ভৈরব শ্রীবামদেবের সিদ্ধিলাভ হয়েছিল বলেও একটি মিথ প্রকাশিত, যে তথ্যের কোন সত্যতা নেই। কারণ শিবাবতার এই তিথিতে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কিংবা দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়া বিদ্যা তারাও আবির্ভাব তিথিও কৌশী নয়। দেবীর ব্রহ্মশিলার আবির্ভাব তিথি শুক্লা চতুর্দশী তিথি (কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আগের দিন)। আর তারাপীঠের উগ্রতারার প্রতিষ্ঠা তিথি হল কালরাত্রি তিথি, যাকে আমরা দীপান্বিতা কালীপূজার তিথি (কার্তিক অমাবস্যা) বলেই উল্লেখ করে থাকি। কারণ বঙ্গে যিনি কালী তিনিই তারা। তাই শাস্ত্র অনুযায়ী কার্তিক মাসের অমাবস্যাকেই কালী ও তারার প্রতিষ্ঠা তিথি বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই সনাতন হিন্দুধর্মকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই সঠিক তথ্য সকল ভক্তের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। অযথা ভ্রান্ত তথ্য কিংবা কুসংস্কার ছড়ানো সঠিক সাধকের কর্ম নয় বলেই বিচার্য। এমন অনেক শাস্ত্রীয় তথ্যই ক্রমে অপভ্রংশের রূপ নিয়েছে, যা কদাপি কাম্য নয়। প্রতিটি অমাবস্যার মতন কৌশী অমাবস্যাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্রে। প্রতিটি মন্দিরে এই তিথিতে দেবীর বিশেষ পূজাপাঠ সম্পন্ন হয়। তবে পূজার সঙ্গে কুসংস্কার কিংবা মিথকে গুলিয়ে ফেলা কখনও উচিত নয়।